বইয়ের ঠিকানা

For Sharing

প্যাসেজ টু ইণ্ডিয়ার প্রথম এডিশনের বইটা পেয়ে যাওয়া সম্ভব ওই যে পুরনো স্টক এক্সচেঞ্জ  বিল্ডিং এর গা ঘেঁষা ফুটপাথে। ডেলাইট সিনেমা হলের সামনের ভিড়টা কিসের? কাছে গিয়ে দেখা যাবে ১৯৪৭ সালের সংবাদপত্রের সংকলন করা একটার পর একটা বাঁধানো বই পাওয়া যাচ্ছে। সেই অমূল্য সংগ্রহ কে আগে নিজের কাছে পাবে সেই উদগ্রীব প্রতীক্ষা।  প্রথমবার সংশোধন হওয়ার পর সংবিধানের কোন বইটা পাওয়া যাবে? গোলচা সিনেমার দিকে একটু হেঁটে যেতে হবে। তারপর বাঁদিকে যে বিক্রেতা সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেই সম্ভাব্য ক্রেতাদের দিকে হাত নাড়েন তাঁকে জিজ্ঞাসা  করা দরকার। এ ব্যাপারে তিনিই বিশেষজ্ঞ। এই সকালবেলায় ফুটপাথ ধরে হাঁটার সম্ভাবনা নেই। এই সকালগুলোয় লালকেল্লা, দিল্লি গেটের বাতাসে শুধুই ইতিহাসের গন্ধ তা নয়, ছড়িয়ে পড়ে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সিলেবাস আর প্রাচীনতার ছাপ পড়া জীর্ণ অতীতকে আঁকড়ে থাকা অন্তহীন স্মৃতির ছাপ রেখে যাওয়া হঠাৎ পাওয়া সম্পদ। এই হল দিল্লির রবিবারের বই বাজার। এবং প্রায় ৫০ বছরের পুরনো এই বই বাজারের উপর যবনিকা নেমে আসার সংবাদে কয়েকমাস ধরেই  দিল্লিবাসীর মনে জমেছে বিষণ্ণতা। রবিবারের দরিয়াগঞ্জ এই কেজো শহরের মধ্যে যেন এক টুকরো মরুদ্যান ছিল। বইমেলা, বইয়ের দোকান, আধুনিক বুকশপ তো অনেক আছে। কিন্তু এরকম একটি আস্ত বইবাজার তাও আবার রাস্তায়, ফুটপাথে দেশের আর কোথায় আছে। কলেজস্ট্রিট তুলনায় আসে না। কারণ কলেজস্ট্রিট তো একটি সামগ্রিক সম্বৎসরের বই সাম্রাজ্য। দুনিয়ার কোথাও তার জুড়ি মিলবে না হয়তো। তার আয়তন, চরিত্র, বৈশিষ্ট্যও পৃথক। কিন্তু পুরনো দিল্লির এই সানডে বুক মার্কেটের ঐতিহ্য নিছক বই বিপণন নয়। যেন একটা সফর। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে পুরনো বই কিনতে  উৎসুকভাবে ফুটপাথে ঘন্টার পর ঘন্টা হয়তো বসে থাকেন অধ্যাপক আর স্কুলপড়ুয়া। কেউ আসে পুরনো বই কিনতে। কেউ আসে পুরনো বইয়ের গন্ধ নিতে। কেউ শুধুই বই হাতে নিয়ে  ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে চলেছে খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু আচমকা সেই ৫০ বছরের পুরনো বইপাড়ায় শেষ পরিচ্ছদ যেন হাজির হল। পুরসভা আপত্তি তুলল। কারণ রবিবার এই ব্যস্ত পুরনো দিল্লির রাস্তায় গাড়ি চলাচল হয়ে ওঠে অসাধ্য। পুরসভার ওই আপত্তি স্বাভাবিক নিয়মে পৌঁছয় আদালতে। আর আদালত ঘোষণা করে এই যুক্তি অবশ্যই সঠিক। সত্যিই তো এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা কেন বন্ধ হয়ে থাকবে একটা প্রায় গোটা দিনের সিংহভাগ? অতএব বইবাজার বন্ধের নির্দেশ। যুক্তিতে হেরে গেলেও দিল্লির বইহৃদয়ের মনে বিষণ্ণতা  জমে রইল। নতুন বই কেনার বিপণির অভাব নেই। কিন্তু পুরনো বই কেনার প্রলোভনই তো শেষ কথা ছিল না। পুরনো একটি বই আবিষ্কারের আনন্দই ছিল যেন এক অনন্ত তৃপ্তি। কেন পুরনো বই এত হৃদয়গ্রাহী? শুধুই সস্তা মূল্যে পাওয়া যায় তাই জন্য? একেবারেই নয়। প্রতিটি পুরনো বইয়ের সঙ্গে লেগে থাকে একটি করে কাহিনী। অজানা গল্প। হয়তো ৬০ বছর আগে সেই বই কেউ উপহার পেয়েছেন বিবাহে। তাঁর উত্তরপুরুষরা সেই প্রবীণ হয়ে যাওয়া দম্পতির এই উপহারকে বিশেষ সংগ্রহযোগ্য সম্পদ হিসাবে মনে করেনি। তাই সে বইয়ের স্থান হল বইবাজারে। বহুকাল পর সেই বই কোনও এক রবিবারের ক্রেতার চোখে পড়ল। এবং তিনি গভীর মায়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করলেন বইয়ের উপর লেখা উপহার প্রদানকারীর এক বিশুদ্ধ শুভেচ্ছা। নীচে লেখা তারিখ। হলুদ হয়ে যাওয়া তারিখে মিশে ছিল একটি নতুন জীবন শুরু হওয়ার আশানিরাশা। সেই জীবনটি এই ৬০ বছর পর কোথায় আছে? কী হল সেই বিবাহের পরিণাম? সেসব জানা  যাবে না। কিন্তু এই জীর্ণ বই যেন সেই কাহিনীর শেষ সাক্ষী।  সুতরাং এই স্মৃতির বইবাজারের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিল্লির এক বিরাট অংশই ডুবে গেলেন বিষাদগ্রন্থে। ঠিক তখনই এক শরতের আকাশের মতো খুশি ঢুকে এল সম্প্রতি। দেখা গেল শেষ রবিবার আইটিও মেট্রো স্টেশনে যেন একটু অপ্রত্যাশিত ভিড়। রবিবার সকালে ভিড় তখনই হবে যখন ভারতের কোনও ক্রিকেট ম্যাচ থাকবে নিকটের ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে। যে স্টেডিয়ামের নতুন নামকরণ অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম। কিন্তু রবিবার তো কোনও ম্যাচ নেই। তাহলে এই ভিড় কেন? উত্তর শুনে দিল্লিবাসীর অন্তর যেন শান্ত হল। অনেকদূর হেঁটে এসে যেন আকন্ঠ জলপানের তৃপ্তি। বইবাজার আবার চালু হয়েছে। পেয়েছে নতুন স্থান। তাই আবার মানুষ যাচ্ছেন সেখানে। এতদিন যেখানে হয়ে এসেছে  সেই দরিয়াগঞ্জের অন্য প্রান্তে হয়েছে নতুন বইঠিকানা। সুসংবাদ ছড়াতে দেরি হয় না। তাই যত বেলা অগ্রসর হল মধ্যাহ্নের দিকে দেখা গেল দলে দলে বইপ্রেমী মানুষ হাঁটছেন লালকেল্লার দিকে। ইতিহাসের খোঁজে নয়। ঐতিহ্যের দিকে। দখিনা বাতাসের দিকে। দিল্লি বইবাজার সাময়িক বিরতির পর আবার স্বমহিমায় ফিরে এল। ফিরে এল স্মৃতির শহর!

(রচনা – মানসী দত্ত বসু )