দিল্লীর রূপ আমি দেখিয়াছি

For Sharing

দিল্লী তুমি মৃন্ময়ী

তুমি চিন্ময়ী

তুমি অপরূপা সুন্দরী

তুমি আশা

নির্বলের ভাষা

তুমিই  মা সুরেশ্বরী

 

শব্দগুলি তোমাদের বেমানান লাগিলেও, কথাগুলি সত্য। সনাতন সত্য, ব্রহ্ম সত্য। আমি দিল্লীতে জন্মিয়াছি। এখানেই পড়াশোনা করিয়া বড় হইয়াছি। কর্ম সূত্রে বিদেশ ভ্রমণ করিলেও, জীবিকা উপার্জন হেতু আমায় দিল্লী ত্যাগ করিতে হয় নাই। দিল্লী মাতৃবৎ আমাদিগকে লালন পালন করিয়া আসিতেছে। সময় বদলাইয়াছে, যুগ পালটাইয়াছে, কিন্তু দিল্লীর এই মাতৃরূপ পাল্টায় নাই। দিল্লীর রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই এই কথাগুলি বলিতে পারিতেছি।

দিল্লীতে এখন যারা জন্মিয়াছে তাহাদের কি করিয়া বুঝাইব যে এল ই ডি’র তীব্র আলোর বিস্ফোরণে তাদের চোখ ধাঁধাইয়া গিয়াছে। চোখের মণি যুগল সংকুচিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের কি করিয়া বুঝাইব তীব্র আলোর মায়াবি কিরণে হেথায় বিষয় বস্তু ধরা পড়িলেও জীবনকে খুঁজিয়া পাওয়া অতীব দুষ্কর। গুগোল মহাশয় তোমাদিগকে কেরোসিনের বাতির ছবি দেখাইলেও কেরোসিন বাতিরও যে প্রাণ আছে ইহা কিন্তু কহে নাই। তোমরা হাসিতেছো! হাসিতে পারো।

ছোট বেলায় হ্যারিকেন জ্বালিয়া সন্ধাবেলা নিত্য পড়িতে বসিতে হইত। বাবা পড়া দিয়া উঠিয়া যাইতেই হ্যারিকেনের বাতি আমাদের শিশুমন রাখিতে জীবিত হইয়া উঠিত। মনে হইত সোনার কাঠি আর রুপোর কাঠির স্পর্শে প্রাণ ফিরিয়া পাইয়াছে। তখন কচি কচি আঙ্গুল দিয়া দেওয়ালের বুকে কতো ছায়া ছবি বানাইতাম। কেরোসিনের শিখায় আস্তে করিয়া ফুঁ দিবা মাত্র সেই ছায়াছবিগুলি হেলিয়া দুলিয়া জীবিত হইয়া উঠিত। শিশু মনের স্পন্দন, কেরোসিনের শিখা আর সেই ছায়াছবি একত্রে এক-সুর – এক-ছন্দে নাচিয়া উঠিত। হেথায় সুর আর ছন্দ পতনের কোন স্থান নাই। ঈশ্বরের তৈরি এমত শ্রেষ্ঠ বৃন্দ বাদন  কেউ কভু দেখিয়াছে কি! তখন মনে হইত, মা সরস্বতী স্বয়ং আড়াল হইতে এই বৃন্দ বাদন  দেখিতেছেন। দিদি আমার  পড়ার প্রতি অনীহা  দেখিয়া পড়াশোনার মূল্যবোধের জ্ঞান দিবার বৃথা চেষ্টা করিত। পরে নিজেই লোভ সম্বরণ  করিতে না পারিয়া আমার সহিত খেলায় মাতিয়া উঠিত। যদিও দিদির মনের সিকি ভাগ বাবার পদশব্দের জন্য সর্বদা উদগ্রীব হইয়া থাকিত। তাহাতে দিদির আনন্দ উপভোগের খাতে ভাটা পড়িলেও আমার ভাগে কিন্তু ষোলোআনাই থাকিত। দিদি বুঝিতে না পারিলেও আমি বুঝিতাম, কেরোসিনের শিখা কিন্তু বাবার আগমনের পূর্বানুমান করিতে পারিত। বাবার আসিবার পূর্বে দেখিতাম ও কেমন যেন হটাৎ  স্থির হইয়া যাইত, কিছুতেই নাচিতে চাহিত না। অনতি পরেই বাবা পড়া ধরিতে ঘরে প্রবেশ করিত। বলাই বাহুল্য, বাবার শাসন গর্জনের ও মূক সাক্ষী হইয়া থাকিত। বাবার বকা-ঝকার পরিণাম স্বরূপ থুতনিখানা বুকে গিয়া ঠেকিত। কিছুতেই মাথা তুলিতে পারিতাম না। গুরত্বাকর্ষণের অতি আকর্ষণের ঠেলায় মাথা তোলা ভার হইয়া উঠিত। সুযোগ বুঝিয়া চোখ পিট পিট করিয়া কেরোসিনের শিখাকে আড় চোখে দেখিয়া লইতাম। দেখিতাম ও আমার নত মস্তিকের দিকে স্থির হইয়া তাকাইয়া রহিয়াছে। সমস্ত রাগ উহার ওপর গিয়া পড়িত। রাগ প্রকাশের তখন কোন অবকাশ ছিল না। নিরুপায় হইয়া এদিক ওদিক মুন্ডী ঘুরাইয়া মা সরস্বতীকে খুঁজিবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করিতাম। খুঁজিয়া পাইতাম না। আমার দিল্লীর শৈশব এই ভাবেই কাটিয়াছে।

যাক সে কথা, দুর্গা পূজা আসিয়াছে। সাজ সাজ রব সর্বত্র। দিল্লীও ইহার ব্যতিক্রম নহে। মনে পড়িতেছে, স্কুলে যাইবার পথে যমুনার বুকে কাশ ফুল ফুটিয়া থাকিতে দেখিয়াছি। শরতের আগমনী বার্তা। ইহার পূর্বে কাশ ফুলের সহিত দিল্লীর দুর্গা পূজা প্যান্ডেলে “পথের পাঁচালি”-র মাধ্যমে পরিচয় হইয়াছিল। রেডিও তখন সর্বসাধারণের মনোরঞ্জনের একমাত্র মাধ্যম হইলেও দুর্গা পূজা ছিল আমাদের একমাত্র আনন্দের উৎস। ঢাকের বাজনা এখনকার মত এত সহজলভ্য ছিল না। ঢাকের বাজনা কোন ক্রমে ষষ্ঠী হইতে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা পর্যন্ত গড়াইয়া যাইত, যদিও কানে থাকিত আরও বেশ  কিছু দিন।

তখন দিল্লীর দুর্গা পূজা মানেই পাড়ায় পাড়ায় নাটক মঞ্চস্থ করা। ছোটদের নাটক, মায়েদের নাটক আর বড়দের নাটক। সাথে ছিল আনন্দমেলার রকমারি সুস্বাদু ব্যঞ্জন, আবৃত্তি  প্রতিযোগিতা, শঙ্খ ধ্বনি প্রতিযোগিতা, উলু ধ্বনি প্রতিযোগিতা, আলপনা প্রতিযোগিতা, ফেন্সি ড্রেস প্রতিযোগিতা। পূজার মাস দুয়েক পূর্ব হইতে দিল্লীর প্রতিটি বাঙালী যেন মোহগ্রস্থ হইয়া পড়িত। মা আসিবে, ইহার চেয়ে বড় আর কি হইতে পারে! পূজা মানেই তো সমগ্র বাঙালী জাতির স্বপ্ন পুরণের দিন। মা আসিবে, স্বপ্ন পুরন করিবে। ইহাই প্রথা, ইহাই বাঙ্গালীর সংস্কৃতি।

দিল্লির পূজা মানেই সার্বজনীন পূজা। পশ্চিমবঙ্গের ন্যায় দিল্লীতে বনেদি পূজা বা পারবারিক পূজার প্রচলন ছিল না। পূজার আয়োজনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দিল্লীর প্রতিটি বঙ্গ পরিবারের আন্তরিক ছোঁয়া কিন্তু অপরিহার্য ছিল। মাকে খাওয়াতে হইবে তাই বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হইতো তিলের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া, খইয়ের মোয়া, চিঁড়ের মোয়া ইত্যাদি। বাজার হইতে কোন জিনিস সোজা কিনিয়া মাকে খাওয়ান হইত না। পূজার ঐ কয়টি দিনে তখন দিল্লীর আকাশে বাতাসে ছিল হৃদয়ের ও আন্তরিকতার ছোঁয়া।

সময় গড়াইয়া গিয়াছে। দিল্লীর দুর্গা পূজা গড় সংখ্যায় ৩৫০ ছাপাইয়া গিয়াছে। দিল্লী সরকার সামাল দিতে হিমসিম খাইতেছে। আজ দিল্লীর দুর্গা পূজা মানেই বহির্শিল্পীদের মহাকুম্ভ বলিলে অতিশয় উক্তি হইবে না। মা আজো খালি হাতে তাঁর বাপের বাড়ি আসেন না, অর্থ ছড়াইতে ছড়াইতে আসেন। অর্থ প্রাচুর্যে দিল্লীর পূজা আজ আলোকিত। আজ চোখ ঝলসানো পূজায় মায়ের উপস্থিতি অনুভব করিলেও হৃদয়ের উষ্ণতার অভাব বড়ই প্রবল হইয়া উঠিয়াছে।

আধুনিকতার স্রোতে সমাজ বহমান। দিল্লীও ইহার ব্যতিক্রম নহে। ভিটেহীন বাঙালী দিল্লীতে আসিয়া তিলে তিলে গড়িয়া তুলিয়াছিল তার একান্ত নিজস্ব বাঙালী সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। মা তুমি এই সংস্কৃতিকে দিল্লীর বুকে পুনঃ স্থাপন করো, এটাই তোমার কাছে আমার একমাত্র প্রার্থনা।

(রচনা -শুভা রায়)