রাষ্ট্র সঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

For Sharing

ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী গতকাল রাষ্ট্র সঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ, অন্তর্ভুক্তি ও জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপে কার্যকরী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা’র বিষয়ে সাধারণ বিতর্কে তাঁর বক্তব্য রাখেন।

চার বছর আগে ২০১৫র ২৫শে সেপ্টেম্বর একযোগে এক দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের বিষয়ে ‘২০৩০ কার্যসূচী’ গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব নেতৃত্বের সঙ্গে রাষ্ট্র সঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। দারিদ্র্য দূরীকরণের ওপর জোর দিয়ে জাতীয় স্তরে উন্নয়নের লক্ষ্য স্থির করে ভারতের সাফল্য ‘২০৩০ কার্যসূচীর’ সফল রূপায়নের দিশায় ভারতের অন্যতম প্রধান অবদান। 

ভারতের এই অবদানের কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে যথার্থই তুলে ধরেন। এই বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রয়াস দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অন্তর্ভুক্তির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং বিশ্বে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এই প্রয়াসগুলির মধ্যে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রকল্প, জনধন যোজনা প্রয়াস যার মাধ্যমে ৫ বছরে ভারতের দরিদ্র জনগণের ক্ষমতায়নের দিশায় ৩৭ কোটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। আধার প্রকল্প ভারতের ১২০ কোটি নাগরিককে বায়োমেট্রিক সনাক্তকরণ ডাটাবেসের মাধ্যমে ডিজিটাল উপায়ে ক্ষমতা দিয়েছে এবং  প্রশাসনিক দুর্নীতি কমিয়েছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনস্বাস্থ্য প্রয়াস স্বচ্ছ ভারত অভিযানে ৫ বছরে ১১কোটি শৌচালয় তৈরি করে দেশকে খোলা জায়গায় মলত্যাগ মুক্ত করেছে। বিশ্বের সবথেকে বড় স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রকল্প আয়ুষ্মান ভারত ৫০ কোটি মানুষকে সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রদান করেছে। 

ভারত ২০২৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্মূল করতে; ৫ বছরের মধ্যে ১৫ কোটি গৃহে পানীয় জল সরবরাহ এবং ২০২২ সালের মধ্যে দরিদ্রদের জন্য ২কোটি গৃহ নির্মানে অঙ্গীকারবদ্ধ। 

জলবায়ু বিষয়ক পদক্ষেপ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ভারতে পুনর্নবীকরণ শক্তি উৎপাদন ১৭৫ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ৪৫০ গিগাওয়াট করার লক্ষ্যমাত্রার সিদ্ধান্তের উল্লেখ করেন এবং  আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে একবার ব্যবহৃত হয় এমন প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন। এই উদ্যোগগুলি আন্তর্জাতিক সৌর জোট সহ জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপের বিষয়ে ভারতের  আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের উদ্যোগ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করতে পারে এমন পরিকাঠামো তৈরির জন্য একটি বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকাঠামো বিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট গঠনের প্রস্তাব দেয়। 

প্রধানমন্ত্রী জানান যে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন অর্জন তার জনকল্যান ও শান্তির প্রতি সংকল্পের মধ্যে দিয়েই এসেছে। ভারত দেখিয়েছে জনকল্যানের ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ এবং ‘কেবল আমাদের জনগণের কল্যানই নয়, সমগ্র বিশ্বের কল্যানে’ ভারতের প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী বলেন আমাদের লক্ষ্য হল ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’- অর্থাৎ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সবার উন্নয়ন ও সবায়ের আস্থা অর্জন। 

বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মুখোমুখি বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর এই ভাষণ ভারতকে বহুপাক্ষিকতার অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে তুলে ধরে। 

তিনি তামিল কবি কানিয়ান পুংগুন্ড্রানার কথা উদ্ধৃত করে বলেন- ‘আমরা সমস্ত জায়গার এবং সকলেরই’ যা সদর্থেই দর্শনগত দিক থেকে ভারতের  শতাব্দী প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা। ১৮৯৩ সালে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তার এবং মহাত্মা গান্ধীর সত্য ও অহিংসার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। 

বহুপাক্ষিকতাকে মজবুত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে বলেন, রাষ্ট্র সঙ্ঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যদিও ভারতই সবথেকে বেশি সেনা পাঠিয়েছে তবুও ‘ভারত হল সেই দেশ যারা বিশ্বকে কোনো যুদ্ধ দেয় নি বরং বুদ্ধর শান্তির বার্তা  দিয়েছে’। তিনি সন্ত্রাসবাদকে বিশ্বের সামনে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং মানবতার স্বার্থে একযোগে তার মোকাবিলার প্রয়োজনের কথা বলেন। 

নতুন নতুন প্রযুক্তি ‘সামজিক জীবন, ব্যক্তি জীবন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’কে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত করছে বলে উল্লেখ করে তিনি আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বের প্রয়োজনের ওপর জোর দেন। তিনি,  বহুপাক্ষিকতা ও রাষ্ট্র সঙ্ঘকে আরও মজবুত ও এক নতুন দিশায় চালিত করে বিভাজন ও সংকীর্ণচিত্ততার মোকাবিলা করার আহ্বান জানান।  

রাষ্ট্র সঙ্ঘের ৭৪তম অধিবেশনের অন্যতম বিচার্য বিষয় ছিল ২০১৯ সালের জুন মাসে সদস্য দেশগুলির গৃহীত  বহুপাক্ষিকতার বিষয়ে রাষ্ট্র সঙ্ঘের সম্মিলিত অঙ্গীকার রূপায়ন করা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ এই লক্ষ্য অর্জনের একটি রূপরেখা তৈরিতে ভারতের যথেষ্ঠ ভূমিকার দিশা নির্দেশ করে যা ২০২০ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র সঙ্ঘের ৭৫তম বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত হবে। 

[মূল রচনা-  অশোক মুখার্জী]