অহিংসাঃ বিশ্বজনীন শান্তির জন্য গান্ধীজীর হাতিয়ার

For Sharing

অহিংসা এবং শান্তির দূত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তিনি ভারতে জাতির জনক বলে সমাদৃত। সারা বিশ্ব তাঁকে জানে মহাত্মা বলে। রাষ্ট্রসংঘ বিশ্বে অহিংসা এবং শান্তির বার্তা প্রচারে তাঁর জন্মদিন ২রা অক্টোবর আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবে উদযাপন করে। তিনি সত্য এবং অহিংসার ভিত্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গান্ধী বলেছিলেন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হল অহিংসা। ধ্বংসের কাজে নিযুক্ত সব চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের চেয়েও  এটি অধিক শক্তিমান।

বিশ্বের অনেক নেতা, দেশ এবং সম্প্রদায় মহাত্মা গান্ধীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। সারা বিশ্বের অনেক নিপীড়িত সমাজ সাফল্যের সঙ্গে গান্ধীবাদকে ব্যবহার করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজা মার্টিন লুথার, ভীয়েতনামের বিপ্লবী নেতা হো চি মিন এবং মিয়ানমারের আং সান সু চি মহাত্মা গান্ধীর অব্যাহত প্রাসঙ্গিকতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

পোলান্ডের গান্ধীবাদী লেস ওয়ালেসা সেদেশের কম্যিউনিজ্‌মের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, তাঁর ভিত্তি ছিল অহিংসার নীতি। কার্ডিনাল জেম সিনের নেতৃত্বে  ফিলিপিনো জনগণের আন্দোলন রাষ্ট্রপতি মার্কোসের একনায়কতন্ত্রের পতনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। চেকোস্লোভাকিয়ায় অহিংস আন্দোলন সোভিয়েত শাসনের পতন ঘটায়।

১৯৯০এর দশকের গোড়ার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ এবং জন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং  এর ফলেই নেলসন ম্যান্ডেলা মুক্তি পান  এবং দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ম্যান্ডেলার নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল গান্ধীর অহিংস নীতিতে পরিপূর্ণ আস্থা। আর  এর মাধ্যমেই দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যবাদের বিলোপ ঘটে। এই নীতি ম্যাক্সিক্যান-আমেরিকান শ্রম আন্দোলন এবং নাগরিক অধিকারের নেতা সিজার চাভেজের ওপর গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। অতি সম্প্রতি ২০১১র আরব স্প্রিং নামে পরিচিত গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের শান্তিপূর্ণ অভিযানে অহিংসার নীতি আবারও প্রমাণিত হয়েছে। মধ্য প্রাচ্য এবং আফ্রিকায় স্বৈরাচারী এবং  অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মাধ্যমে। উপসাগরীয় অঞ্চল এবং পশ্চিম এশিয়াতেও এই পথেই সংস্কার সাধিত হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা প্রমান করে দেখিয়েছে যে অহিংসা দ্বন্দ্বের অবসানে অধিক শক্তিশালী এবং কার্যকর বলে প্রমাণিত হতে পারে।

দালাই লামা বলেছেন আজকের লড়াই হল বিশ্ব শান্তি এবং বিশ্ব যুদ্ধের মধ্যে, মনের শক্তি এবং বস্তুবাদের শক্তির মধ্যে, গণতন্ত্র এবং বহুত্ববাদের মধ্যে। আর বর্তমান সময়ে  এই লড়াইয়ের জন্য একান্ত প্রয়োজন হল গান্ধীবাদী দর্শনের।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার বলেছেন মানবজাতির প্রগতির জন্য গান্ধী অপরিহার্য।  কিন্তু তাঁর অনুসরণকারী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা, দালাই লামা, আং সান সু চি, বরাক ওবামা, দেসমন্ড টুটু এবং আর্জেন্টিনার এ্যাডল্‌ফ পেরেজ এসকুইভেল নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন, তাই এটি অবধারিত যে মহাত্মা গান্ধী নোবেল পুরস্কারের উর্ধে।

অহিংসার অর্থ কেবল শান্তি বা হিংসার অভাব বোঝায় না, মহাত্মাগান্ধী যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে এটি সর্ব অর্থে সক্রিয় ভালোবাসা। গান্ধীজী অহিংসাকে সর্বাত্মকভাবে জীবনে রুপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। মানবাধিকার এবং প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আজ যখন বিশ্ব শান্তি বিঘ্নিত, মানুষের জীবন পরমাণূ অস্ত্রের  আশংকায় বিপন্ন, মহাত্মা গান্ধীর প্রেম এবং সত্য এবং অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা আরো অধিক প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

এ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং গান্ধী পরস্পরের অনুরাগী ছিলেন এবং তাদের মধ্যে চিঠিপত্রের আদান প্রদান ছিল। আইনস্টাইন গান্ধীকে আগামী প্রজন্মের রোল মডেল বলতেন। আজ বিশ্ব যখন মহাত্মার সার্ধোশততম জন্ম বার্ষিকী উদযাপন করছে তখন গান্ধীর প্রশংসায় আইনস্টাইনের  উক্তি স্মরণ করে আমাদের মনে রাখতে হবে আইন ও ন্যয় বিচারের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তই কেবল মানব জাতির ভবিষ্যৎ  রক্ষা করতে  পারে।  (মূল রচনাঃ   ডোমিনিক থমাস)