“নমস্তে জগৎতারিণী ত্রাহি দুর্গে”

For Sharing

ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত-অম্বর-মাঝে,

দিকে দিগন্তরে ভুবনমন্দিরে শান্তিসঙ্গীত বাজে॥

হেরো গো অন্তরে অরূপসুন্দরে, নিখিল সংসারে পরমবন্ধুরে,

এসো আনন্দিত মিলন-অঙ্গনে শোভন মঙ্গল সাজে॥

মায়ের বোধন হয়ে গেল। চলেছে দেবীর পূজার্চনা, পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ নিবেদন, সন্ধি-পুজো, আরতি, শংখ-ঘন্টা-ঢাকের নৈস্বর্গিক বাদ্য। উৎসব প্রাঙ্গন মুখরিত। সবার মুখে হাসির ছোঁওয়া। হতাশা-নিরাশার লেশমাত্র কোথাও নেই। এ হল দিল্লির বাঙালির সার্বজনীন শারদীয়া দুর্গোৎসব। উৎসব একদিকে আনন্দের প্রকাশ অন্যদিকে উপার্জনের মাধ্যমও বটে।

কালের বিবর্তনের সঙ্গে উৎসবের স্বরূপ বদলেছে, আবার নতুন সৃষ্টিও হয়েছে। তবে সব উৎসবের মূলে রয়েছে আনন্দ; সমস্ত দুঃখ শোক, ব্যথা বেদনা ভুলে কেবল আনন্দ সাগরে নিমজ্জিত থাকা। তাইতো এত আয়োজন।

হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ উৎসব বেদ-পুরাণের দেব-দেবী নির্ভর। জাতীয় স্তরে, হোলি, দেওয়ালি, রামনবমী, দশেরা, জন্মাষ্টমী, শিবরাত্রি, গণেশ চতুর্থী বা আঞ্চলিক স্তরে পোঙ্গল, ওনাম, তীজ,বিহু, ছট, গঙ্গাসাগর মেলা বা আরো রকমারি উৎসব। বাঙালির কথা বলতে গেলে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বারো মাসে তেরো পার্বণ।  তবে সকল বাঙালি মিলে উদযাপনের সত্যিকারের উৎসব মানে তো দুর্গোৎসব।  আগেকার দিনে ধর্মীয় ভেদাভেদ প্রখর ছিল না। গ্রামাঞ্চলে দুর্গাপূজায় যোগ দিতেন আপামর পল্লীবাসী। গ্রামীণ সমাজের এক ঘেয়ে জীবনযাপনে বৈচিত্র এনে দিত এই দুর্গাপুজো।

মনে হয় এই তো সেদিনের কথা, গ্রামের বটতলা আমতলা ছেড়ে, পাড়ার চন্ডীমন্ডপ ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঠাঁই নেওয়া হয়েছিল শুষ্ক কঠিন এই মহানগরে। পড়ন্ত বিকেলের মন মাতানো শিরশিরে হাওয়া হাতছানি দিয়ে গেছে, শিশির সিক্ত শরতের ভোরের সকাল ডেকে গেছে কতবার। চির চেনা শিউলি মালতি, হাসনুহানা, মল্লিকা বকুলেরা পুজোয় আসতে বলেছে আমায়। মহালয়ার রাতজাগা জোনাকিরা খবর পাঠিয়েছে তাদের ভাষায়। কিন্তু এই শহরের পুজো আমায় টেনে রেখেছে দুর্নিবার আকর্ষণে। কি আছে এখানকার পুজোয়? কাশ্মীরি গেট, তিমারপুরের ১০০ বছর পেরিয়ে যাওয়া পূজোর ঐতিহ্য আছে, নিউ দিল্লী কালীবাড়ির সাবেকিয়ানা আছে, মিনি কলকাতা চিত্তরঞ্জন পার্কের চোখ ধাঁধাঁনো মন্ডপ সজ্জায় আলোর রোশনাই আছে, প্রতি বছর বেড়ে চলা অসংখ্য নতুন পুজো প্যান্ডেল আছে। আনন্দ মেলার অনাবিল আনন্দ আছে। এসব ছাড়াও  আছে এক অনির্বচনীয় প্রাণের স্পর্শ। যে মন্ডপেই যাই না কেন “একেবারে আপনার বলিয়া বোধ হয়”। সময়ের দাবি এবং রুচির বিবর্তনে দিল্লিতেও এসেছে প্রতিমা তৈরিতে অভিনবত্ব। লোকশিল্প থেকে আধুনিকতা, সাবেকিয়ানা থেকে বিমূর্ত শিল্প৷

এই মনের কথা প্রাণের কথা ছাড়াও রাজধানীর এই প্রাচুর্যের শহরে পুজোয় বাণিজ্য লক্ষ্মী আছে। প্রাক-পুজো শাড়ী মেলায় বাংলা সহ সারা দেশের দোকানীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন, শত শত ঢাকীর সম্বৎসরের রোজগারের ঠিকানা দিল্লীর পুজো মন্ডপগুলি, দিল্লির প্রতিমা শিল্প এবং মণ্ডপ সজ্জায় এক বড় ভূমিকা বাংলার গ্রাম-গঞ্জের মৃৎশিল্পীদের। পুরো পরিবার নিয়ে পুজোর অনেক আগেই তারা চলে আসে দিল্লিতে। কুমোর পাড়া না থাকলেও তাদের ব্যস্ততা আছে। ঢাকি থেকে পুরোহিত কেউ বাদ যায় না। বাংলার প্যান্ডেল নির্মাণের কারবারীরাও তাদের কাজ খুঁজে পায় দিল্লীর পুজোর বাজারে। কলকাতার থিম পুজোর ঢেউয়ের দোলা লেগেছে দিল্লিতেও। জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে থিম বনাম সাবেকিয়ানার। অনেক পুজো কমিটি দশকর্মা থেকে শুরু করে সমস্ত পুজোর বাজার করতে যায় কলকাতায়। পেশাদার শিল্পীরা দিল্লীর পুজো প্যান্ডেলে অনুষ্ঠান করে – এটা অবশ্য নতুন কথা নয় তবে, পুজোর সংখ্যা যত বাড়ছে, কলকাতার, শুধু কলকাতারই বা বলি কেন, সমগ্র বাংলার উদীয়মান, প্রতিষ্ঠিত, নামি দামি, শিল্পীদের চাহিদাও সেই হারে বেড়ে চলেছে। আজকের এই বাজার সর্বস্য অর্থনীতিতে দিল্লীর পুজোকে ভিন্নতর দৃষ্টিতে দেখলে চলবে কেন?

উৎসবের বৈচিত্রও কম বড় কথা নয়, দেবী পক্ষের সূচনা লগ্ন প্রতিপদ থেকে যেমনি বাঙালিদের মধ্যে দ্বিগুণ গতিতে বেড়ে চলে পুজোর তোড়জোড় তেমনি হিন্দুস্থানীদের মধ্যে নবরাত্রি উপলক্ষ্যে পাড়ায় পাড়ায় চলে রামলীলার অনুষ্ঠান। নবরাত্রিতে দেবী দূর্গা পূজিত হন নবদূর্গা রূপে। দেবী দূর্গা এবং নব দূর্গা আদ্যাশক্তিরই অন্য রূপ। আদ্যাশক্তি ঈশ্বরের মাতৃরূপের প্রকাশ। দেবী পক্ষের এই পবিত্র ক্ষণে জগতের কল্যাণ কামনায় দেবী দূর্গার আরাধনায় পুরানে নবদূর্গার নবরূপের বর্ণনায় রয়েছে-

প্রথমম শৈলপুত্রিতি দ্বিতীয়ম ব্রহ্মচারিণী।

তৃতীয়ম চন্দ্রঘন্টেতি কুষ্মান্ডেতি চতুর্থকম।।

পঞ্চমম স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নি তথা।

সপ্তমং কালরাত্রিতি মহাগৌরীতি অষ্টামম।

নবমাং সিদ্ধিদাত্রিতি নবদুর্গা প্রকীর্তিতা।।

অর্থাৎ নবদুর্গা হলেন শৈলপুত্রি, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘন্টা, কুষ্মান্ড, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নি, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রি।

এই জগৎ সংসারের যত রচনা, যত কর্ম কান্ড সব কিছুর লক্ষ্যই মানব কল্যাণ। মানব কল্যাণের কথা চিন্তা করে স্থানীয় প্রশাসন দূষণ রোধে নানান বিধি নিষেধ আরোপ করেছে। দিল্লীর পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট পংক্তি ভোজে ঢালাও ভোগ প্রসাদ বিতরণ এবং দশমীর প্রতিমাভাসান। এবার কার্যতঃ যমুনায় ঠাকুর ভাসানের অবাধ অনুমতি নেই। পুজো কমিটিগুলিকে নিজেদের সাধ্যমত অস্থায়ী জলাশয় নির্মাণ করে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিংগল ইউজ প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করণের আওতায় পড়েছে থার্মোকলের থালা এবং প্লেটও, আর শালপাতার ব্যবহার অনেকদিনই প্রায় উঠে গেছে, তাই বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে।

সন্তান-সন্ততি-সহ জগজ্জননী মা দুর্গাকে বাপের বাড়িতে বরণ করে নেন দিল্লির বাঙালিরা, নিজেদের উজার করে দেন, প্রার্থনা করেন তিনি যেন শান্তির বারি সিঞ্চিত করে এই বিশ্ব চরাচরকে অমল কিরণে স্নিগ্ধ করে তোলেন এই আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন মায়ের শ্রীচরণে…

নমস্তে শরণ্যে শিবে শানুকম্পে

নমস্তে জগৎ ব্যাপীকে

নমস্তে জগৎতারিণী ত্রাহি দুর্গে

নমস্তে জগত চিন্তেমানস রূপে

নমস্তে মহাযোগিনী জ্ঞানরূপে…

(রচনা – অমৃতা দত্ত)