ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা

For Sharing

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডক্টর জয়শঙ্কর তার সাম্প্রতিক মার্কিন সফরকালে বলেন যে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হবে। বাণিজ্য ইস্যুতে যখন উভয় দেশ একাধিক, সমান্তরাল বাস্তবতার সাথে কাজ করছে তা পর্যবেক্ষণ করে তিনি বলেন, প্রথম বাস্তবতা হ’ল এই সমস্যাগুলির অনেকটাই বিদ্যমান ছিল। তারা অনেক বেশি সামনে উঠে আসে কেননা মার্কিন প্রশাসন এই বিষয়গুলিতে এখন প্রাধান্য দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন পণ্যগুলির উপর ভারতের উচ্চ শুল্কের সমালোচনা করেন। মার্কিন বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রী উইলবার রস কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন দিল্লিতে ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সাথে বাণিজ্য আলোচনা করবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দুগ্ধজাত বাজারে প্রবেশ, মেডিকেল ডিভাইসগুলিকে দাম নিয়ন্ত্রণের আওতা থেকে বাইরে রাখা এবং  তথ্য ও যোগাযোগ শুল্ক প্রত্যাহার করার কথা বলছে এবং বিনিময়ে ভারত জিএসপি নামক শুল্কহীন মার্কিন বাণিজ্য কর্মসূচীতে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করছে।

মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে তার বৈঠকের পরে ডক্টর জয়শঙ্কর বলেন যে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে এবং শীঘ্রই একটি চুক্তিও হবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানান যে, বাণিজ্য চুক্তি সহজ পাটিগণিত না হওয়ায় এবং এতে বেশ কয়েকটি পরিবর্তনশীল বিষয় জড়িত থাকায়  আলোচনায় সময় লাগে। বাণিজ্য বিরোধ ছাড়াও দুই মন্ত্রী ক্রমবর্ধমান ভারত-মার্কিন কৌশলগত সম্পর্ক, কাশ্মীরের উন্নয়ন এবং বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা একটি মুক্ত ও অবাধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। উভয়ের মধ্যে এটি ছিল চতুর্থ বৈঠক এবং রাষ্ট্র সঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  সফল সফরের সঙ্গে এই বৈঠক শেষ হয়।

তাঁর সফরকালে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছিলেন। সাতটি বিশেষ বুদ্ধিদাতা মার্কিন সংস্থা বা থিঙ্ক ট্যাঙ্কের কাছে তাঁর সফর, একটা বিষয় স্পষ্ট করেছিল যে  ভারত সরকারি কর্মকর্তাদের ছাড়াও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তার দৃষ্টি আরও প্রশস্ত করতে আগ্রহী। এই বৈঠকগুলিতে জম্মু ও কাশ্মীরের বিষয়টি আলোচিত হওয়ার সময়, তিনি জানিয়েছিলেন যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং ভারতের ঐ রাজ্যটির বিকাশ ভারতের পক্ষে প্রাথমিক গুরুত্বের বিষয়। ভারতের কৌশলটি ছিল মানুষের কাছে যুক্তি দিয়ে  এই সিদ্ধান্ত কেন তাদের দীর্ঘমেয়াদী সুবিধার জন্য তা বোঝানো। যতক্ষণ না হচ্ছে, ভারত সতর্কতা অবলম্বন করবে।

ডক্টর জয়শঙ্কর প্রত্যয়ের সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে এই অঞ্চলে শান্তির জন্য পাকিস্তানের সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি সমাধান করা দরকার। বিদেশমন্ত্রী পম্পেওর সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি এও তুলে ধরেছিলেন যে রাষ্ট্র সঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার জন্য ভারত উপযুক্ত এবং ভারতবিহীন একটি রাষ্ট্র সঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রশ্নচিহ্ন তুলবে। তিনি আরও বলেন যে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ক্রমবর্ধমানভাবে বহুমেরুর হয়ে উঠছে এবং দ্বিমেরু বিশ্বে  ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। তিনিও বলেন যে উদীয়মান বৈশ্বিক প্রাকৃতিক পরিবেশের কৌশলগত উপলব্ধি ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কাছে আনবে। আরও প্রতিযোগিতামূলক ও জটিল যুগের প্রস্তুতির জন্য আলাদা মানসিকতার প্রয়োজন রয়েছে এবং ভারতের মতো একটি দেশের জন্য এটি বিশ্ব শক্তি হিসেবে উঠে আসা পরিবর্তনের পাশাপাশিই হবে। তিনি বলেছিলেন যে ভারত বিশ্বে আরও বেশি বেশি ভূমিকা পালন করছে, তাই এটি জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মতো বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের ধারণা পোষণ করবে এবং সমর্থন চাইবে।

মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে ওয়াশিংটন ডিসিতে লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে বক্তব্য রেখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো একটি বিষয়ে যদি গান্ধীজী আমাদের  মনোযোগ দেওয়ার কথা বলতেন তা অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করাই হতো। নীতি ও পক্ষ সমর্থনের মধ্য দিয়ে, ভারত ২০২২ সালের মধ্যে ১৭৫ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির লক্ষ্যে পৌঁছতে চলেছে।  ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫০ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং বৃহত্তর শক্তি দক্ষতার চেয়ে অনেক বড় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই।  এটিতে স্মার্ট শহর, গণপরিবহন, দীর্ঘস্থায়ী কৃষি বা জলের ব্যবহার সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন জড়িত রয়েছে।

[মূল রচনা- ডক্টর স্তুতি ব্যানার্জী]