ভারত-মার্কিন তেজঃশক্তি সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায়

For Sharing

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে হাউস্টনে পৌঁছে এক টুইট বার্তায় বলেন, তিনি হাউস্টনে আসবেন আর তেজঃশক্তি বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোন কথা হবে না, তা তো হতে পারে না। উল্লেখ করা যায় , টেক্সাসের হাউস্টন স্থানটি বিশ্বের তেজঃশক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলির অন্যতম। ভারত-মার্কিন ঘনিষ্ঠ তেজঃ শক্তি সহযোগিতার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর ঐ টুইট বার্তার প্রাসঙ্গিকতা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এখানেই শ্রী মোদী ভারতের তেজঃশক্তি উন্নয়ন ক্ষেত্রে অধিক মাত্রায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে জ্বালানী ক্ষেত্রের  বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় আধিকারিকদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। এই হাউস্টনেই ‘হাউডি মোদী’ অনুষ্ঠানে  প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্বে  তেজঃশক্তি সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে এক প্রধান স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালেও উভয় নেতা তাঁদের মধ্যে আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত তেজঃশক্তি অংশীদারিত্বের আদর্শে তাঁদের আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি তাঁর ঘোষিত ‘আমেরিকা প্রথম’ তেজঃশক্তি যোজনার আওতায় আইনী প্রতিবন্ধকতাগুলিকে সরিয়ে ভূগর্ভস্থ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডারের অনুসন্ধান ও আহরণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। ভারতেও দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনে তেজঃশক্তির বাড়তি চাহিদা  মেটাতে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিকল্প জ্বালানীর উৎস সন্ধান ও তার উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত বর্তমানে প্যারিস জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে গৃহীত নীতি কৌশল অনুযায়ী গ্যাস ভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় রূপান্তরের উপযোগী কর্ম পরিকল্পনা রচনা করেছে।

ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই, জ্বালানী ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণকারী  বৃহৎ সংস্থাগুলির প্রভাব মুক্ত হতে জ্বালানী আমদানির বিষয়ে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনে অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে চাইছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী অন্যতম দেশ হিসেবে দ্রুত আত্মপ্রকাশ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ গত দু’বছরে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ঐ দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমশ কমছে।

জ্বালানী আমদানি, নিরাপত্তা ও জ্বালানী ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয় করার লক্ষ্যে দুটি দেশ গত বছর তাদের প্রথম কৌশলগত জ্বালানী অংশীদারিত্ব বৈঠক করে।  বৈঠকে যুগ্মভাবে পৌরোহিত্য করেন ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং মার্কিন তেজঃশক্তি সচিব রিক পেরি। এই  বৈঠকে জ্বালানী ক্ষেত্রে সহযোগিতার চারটি প্রধান বিষয় চিহ্নিত করা হয়। যেমন, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস; জ্বালানী ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয়; পুনর্নবিকরণযোগ্য   তেজঃশক্তি ও ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং কয়লা।

এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাক্রমে ভারতের পেট্রোনেট এল এন জি লিমিটেড সংস্থা ও মার্কিন টেলুরিয়ান ইংক সংস্থা সাড়ে সাতশ কোটি মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি সাক্ষর করেছে,  যার আওতায় পেট্রোনেট সংস্থা প্রতি বছরে ৫০ লাখ মেট্রিক টন তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের মালিকানা পাবে। ভারতীয় তেল নিগম ও ভারত পেট্রোলিয়ামের মত সংস্থাগুলিও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে পারবে।  অপরদিকে, গ্যাস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড ও রিল্যায়েন্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস ভিত্তিক প্রকল্পে তাদের লগ্নি অনুযায়ী প্রযুক্তি হস্তান্তরের আওতায় তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে সম্পাদিত এই চুক্তি দ্বিপাক্ষিক তেজঃশক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত।

জ্বালানী সংক্রান্ত বিশ্বের শীর্ষ আধিকারিকরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁদের বৈঠকের পর ভারতের অচিরাচরিত জ্বালানির উৎস সন্ধান ও উন্নয়নের  ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিষয়ে উৎসাহ ব্যক্ত করেন। ভারতে একটি বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ ও কোম্পানি করের হার হ্রাসকে তাঁরা স্বাগত জানান। এদিকে, আন্তর্জাতিক জ্বালানী সংস্থা IEA’র সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে তেজঃশক্তি ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ গত পাঁচ বছরে ৮৫০ কোটি মার্কিন ডলারের মত বেড়েছে। এই বৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক। আগামী দশ বছর সময়েও ভারত হাইড্রো কার্বন ক্ষেত্রের উন্নয়নে যে কর্মসূচি নিয়েছে তাতে  প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ভারত-মার্কিন তেজঃশক্তি সহযোগিতার আওতায় অসামরিক পরমাণু অংশীদারিত্ব আরও মজবুত হয়ে উঠবে ও  স্বচ্ছ জ্বালানী প্রকল্পের আওতায় পাওয়ার গ্রিড ও বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নয়নে অধিক মাত্রায় বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সমগ্র ঘটনাক্রমের নিরিখে ভারত-মার্কিন তেজঃশক্তি অংশীদারিত্ব  এক নতুন মাত্রায় পৌঁছবে বলেই অনুমান।  (মূল রচনা সত্যজিত মোহান্তি)