গান্ধীসরণি

For Sharing

কলকাতার কংগ্রেসে অধিবেশন প্রথম সারির নেতারা এসেছেন। সকলেই ইংরাজিতে কথা বলছেন। ভাষণ দেওয়া হচ্ছে চোস্ত ইংরাজিতে। ১৯০১। দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘদিন কাটিয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতে ফিরেছেন কিছুদিনের জন্য। তাঁর খুব ইচ্ছে, কংগ্রেসের অধিবেশন কেমন হয় সেটা প্রত্যক্ষভাবে জানার। তাই ওই স্বল্প ছুটিতেও তিনি চলে এসেছেন কলকাতায়। গোপালকৃষ্ণ গোখলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল বোম্বাই শহরে। তিনিই বলেছিলেন, কলকাতায় আসতে। কলকাতার রিপণ কলেজে অধেবেশনের বাইরেও একটি পৃথক সভা ডাকা হয়েছিল। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী রিপণ কলেজে যাবেন স্থির করলেন এবং গিয়ে দেখলেন নর্দমার জল এবং মলমূত্রের ট্যাংক ফেটে গিয়ে সামনের রাস্তা এবং রিপণ কলেজের প্রাঙ্গণে রীতিমতো আবর্জনার নরক। ভারতের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনের বার্ষিক অধিবেশনের স্থলে এরকম অস্বাস্থ্যকর এক আবর্জনাময় পরিবেশ এটা যতটা বিস্মিত করল মোহনদাসকে, তার থেকে অনেক বেশি তিনি অবাক হলেন যে আগত সদস্য অথবা অতিথি অভ্যাগতরা কারও যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রত্যেকেই সেই পুতিগন্ধময় আবর্জনা আর পচা জল লাফ দিয়ে কিংবা সতর্কভাবে টপকে যাচ্ছেন অধিবেশন স্থলে। কয়েক মিনিট দৃশ্যটি অবলোকন করার পর মোহনদাস উঁকি মারলেন রিপণ কলেজের শৌচালয়ে। সেখানে প্রবেশের আগেই একটি বারান্দায় তিনি পেয়ে গেলেন তিনি যা খুঁজছিলেন। একটি ঝাঁটা। এক হাতে এক বালতি জল, অন্য হাতে ঝাঁটা। শুরু করে দিলেন ওই অপরিচ্ছন্ন আবর্জনাকে পরিষ্কার করতে। আগত অভ্যাগতদের অনেকেই এই দৃশ্যটি দেখে থমকে গেলেন। কয়েকজন চিৎকার করে বললেন, মিস্টার গান্ধী, আপনি এই কাজটি কেন করছেন? এটা তো মেথরদের কাজ। আপনার পক্ষে এই কাজ শোভা পায় না। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী উত্তর দিয়েছিলেন, এই আবর্জনা বাড়াচ্ছি তো আমরাই। মেথররা তো এখানে মিটিং করছে না, শৌচালয় ব্যবহারও করছে না। করছি আমরাই। তাহলে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব কাদের? ওই ঘটনার পর ১১৮ বছর কেটে গেছে। আজও কি আমরা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ওই শিক্ষাটি আত্মস্থ করতে পেরেছি? আজও কি আমরা স্বচ্ছতার পথে অগ্রসর হয়েছি? স্বচ্ছতার শিক্ষা কিন্তু এটা নয় যে শুধু নিজের পারিপার্শ্বকেই পরিচ্ছন্ন রাখলাম। ঘরে ও বাইরে পরিচ্ছন্নতার প্রয়োগই সঠিক স্বচ্ছতার দিশায় অগ্রসর হওয়া। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর দেড়শতম জন্মবর্ষে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান শিক্ষা‌ই হোক আমাদের পাথেয়।

১৯১৫ সাল, শনিবার সকাল ৯টা। জাহাজের নাম এস এস অ্যারাবিয়া। বোম্বাই  বন্দরে এসে দাঁড়াল। সেই জাহাজ থেকে চিরকালের মতো দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে চলে আসা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং কস্তুরবা গান্ধী নেমেছিলেন ভারতে। যা তাঁর হয়ে উঠবে দ্বিতীয় কর্মভূমি। আর গোটা বিশ্বকে এই ভারত আগামীদিনে প্রদান করবে এমন এক আশ্চর্য শিক্ষা, যার নাম অহিংসা। ভারতে আসার পরই গুজরাতে নিজের বাড়িতে গিয়েছিলেন গান্ধীজি। সেটাই স্বাভাবিক। তবে তাঁর ইচ্ছা, ভারতদর্শন। অতএব গান্ধীজি সর্বাগ্রে গেলেন বেঙ্গলকে দেখতে। এই প্রদেশ সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ অনেকদিনের। এর আগে দু’বার গিয়েছেন বেঙ্গলে। কিন্তু সেটা শুধু‌ই কলকাতা শহর। তার বাইরের গ্রাম্য পরিবেশ দেখা হয়নি। অথচ গ্রামীণ বাংলার লোকশিল্পের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। অতএব একবার তো দেখতে হবে বাংলার গ্রাম। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি রওনা হলেন। সি এফ অ্যান্ড্রুজ নামের এক বিদেশি মানুষ দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কলেজে পড়ান। তবে তিনি মাঝেমধ্যেই চলে আসেন বাংলার একটি গ্রাম্য এলাকায়। অ্যান্ড্রুজের সঙ্গে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সেই দক্ষিণ আফ্রিকার দিনগুলি থেকেই চেনাজানা। গান্ধীজি বাংলায় এসেছেন এবং গ্রামবাংলা পরিদর্শন করছেন শুনে অ্যান্ড্রুজ সাহেব একটি অনুরোধ করলেন। বললেন, একবার একটা জায়গায় আসুন। আপনার ভালো লাগবে। জায়গাটি আসলে একটা আশ্রমের মতো। কিন্তু ধর্মশিক্ষা  নয়। সেটা একটি বিদ্যালয়। নাম, শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছেন। গান্ধীজি আগ্রহী হলেন এবং স্ত্রী কস্তুরবাকে নিয়ে সেখানে গেলেন। তবে, রবীন্দ্রনাথের দেখা পাওয়া গেল না। তিনি বিদেশে গিয়েছেন। আশ্রম দেখে এতই মুগ্ধ মোহনদাস গান্ধী যে তিনি আরও কিছুদিন থেকে যেতে চাইছেন। যাতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয়। অথচ হঠাৎ একটা খবর এল যে গোপালকৃষ্ণ গোখলের দেহাবসান হয়েছে। গোপালকৃষ্ণ গোখলে গান্ধীজির রাজনৈতিক গুরু। সুতরাং, তাঁর অন্তিম কার্যে উপস্থিত থাকতেই হবে। শান্তিনিকেতন থেকে যাওয়ার আগে তিনি লক্ষ্য করলেন, অতিথি বিদায়ের একটি আশ্রমিক পরম্পরা আছে। প্রত্যেক ছাত্র আম্রকুঞ্জে তাঁকে মাঝখানে বসিয়ে করজোড়ে বিদায় সম্ভাষণ জানাল। আর গান্ধীজি তাঁদের আশ্রম জীবনের অবশ্য পালনীয় হিসাবে বলে গেলেন কয়েকটি অমূল্য কথা। তিনি বললেন, রান্না, ঘরের কাজ, নিজের পোশাক সাফাই করা ইত্যাদি ব্যক্তিগত কাজে ছাত্রছাত্রীরা যেন পরনির্ভরশীল না হয়। তাঁরা চেষ্টা করুক এই প্রতিটি কাজে নিজেরাই নিয়োজিত হতে। তাহলে মানুষের শ্রমের মূল্য ছাত্রাবস্থায় গড়ে উঠবে অন্তরের মধ্যে। ১৯১৫ সালের পর ১০৪ বছর কেটে গিয়েছে। আমরা কতজন ওই শিক্ষাটি আজও গ্রহণ করেছি নিজেদের ব্যবহারিক জীবনে? বিশেষ করে পুরুষজাতি? আজ কি আমরা আরও বেশি করে ভারতে বাস করা মানুষ পরনির্ভশীল হয়ে পড়ছি না প্রাত্যহিক কর্মপালনে?

মনীষীদের জীবন ও বাণীকে অনুসরণ করাই হল তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। তাঁদের ঘিরে উজ্জ্বল অনুষ্ঠান পালন করার মধ্যেই যদি তাঁদের স্মরণ করা সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটা হয় প্রতীকী এক শ্রদ্ধানিবেদন। তার থেকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হল তাঁদের প্রদর্শিত পথে অনুগমন করা। সেই পথটিকে গ্রহণ করে নিজেদের চলার পথে ওই পন্থা পালন করা। সেটাই হবে প্রকৃত মনীষী বন্দনা।

(মূল রচনা – সমৃদ্ধ দত্ত)