ইতিহাস কথা বলে

For Sharing

আজ দিল্লির কথা তোমায় বলবো। আজকের যে দিল্লি শহরকে তুমি জানো, অতীতে তা এমন ছিল না। দিল্লি সৃষ্টি হয় সাতটি বিভিন্ন শাসকের সাতটি এলাকা নিয়ে। নামে সাতটি এলাকা হলেও, তার সমষ্টিগত আয়তন কিন্তু বর্তমান দিল্লি থেকে অনেক ছোটো ছিল। এই অঞ্চলগুলির পত্তন হয় বিভিন্ন রাজা বা সুলতানদের দ্বারা। মহাভারতের পাণ্ডবদের দ্বারা যে ইন্দ্রপ্রস্থ রাজ্যের স্থাপনা করা হয়, সেই ইন্দ্রপ্রস্থই দিল্লি।

আজ শুধু মেহরৌলির কথা বলা যাক। কথিত আছে, মহাভারতের যুদ্ধের পর, পাণ্ডবরা এই অঞ্চলে যোগমায়ার মন্দির স্থাপন করেন। পুরাণে এই অঞ্চলকে তাই ‘যোগিনী পুরি’ বলা হতো। যোগমায়া শ্রী কৃষ্ণের বোন ছিলেন। কংস তাঁকে বধ করার জন্য যখন মাটিতে নিক্ষেপ করেন, তখন সেই শিশুটি দেবীর রূপ ধারণ করে আকাশে মিলিয়ে যান। ভবিষ্যদ্বাণী করেন, “তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে”।

মেহরৌলি নামটি নিয়ে বলা হয় এই নামটি এসেছে রাজা মিহির ভোজের নাম থেকে। উনি গুর্জর-প্রতিহারা সাম্রাজ্যের রাজা ছিলেন। আরও একটি মত আছে- ‘মেহের ওলি মাই’ থেকে এই নাম এসেছে। ‘মেহের’ মানে আশীর্বাদ। স্থানীয় বাসিন্দারা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে যোগমায়া দেবীর মন্দিরকে অতি জাগ্রত বলে মনে করেন।

এই অঞ্চলটির উত্তরে মালভিয়া নগর, পশ্চিমে বসন্ত কুঞ্জ ও দক্ষিণে তুঘলকাবাদ। দিল্লি মেট্রোর ইয়েলো লাইনের নিকটবর্তী স্টেশন কুতুব মিনার। সেখান থেকে অটো নিয়ে যাওয়া যায়। গাড়ি নিয়ে গেলে কুতুব মিনারের নিকটবর্তী পার্কিংয়ে রেখে অটো নিয়ে যেতে হবে। গাড়ি মেহরৌলি বাস টার্মিনাল অব্দিও যেতে পারে, তবে সেখানে পার্কিংয়ের কোনও ব্যবস্থা নেই।

এই অঞ্চলটি এতটাই বিস্তৃত যে একদিনে পুরোটা দেখা সম্ভব নয়। আদিতে তোমর রাজা অনঙ্গ পাল প্রথম, ৭৩১ খ্রীষ্টাব্দে লাল কোট নামে একটি দুর্গ স্থাপন করেন। কাহিনী অনুসারে ১১ শতাব্দীতে রাজা অনঙ্গ পাল দ্বিতীয় কনৌজ থেকে তাঁর রাজধানী লাল কোট দুর্গে স্থানান্তরিত করেন। এরপর, ১২ শতাব্দীতে পৃথ্বীরাজ চৌহান তোমর রাজাদের যুদ্ধে পরাজিত করেন ও দুর্গটির নাম হয় কিল্লা রাই পিথোরা। মেট্রো ইয়েলো লাইন এর মালভিয়া নগর স্টেশন থেকে কিছুটা হেঁটে গেলেই এই রাই পিথোরা কিল্লার খানিকটা ভগ্নাংশ দেখা যায়। এটির সংরক্ষণের দায়িত্ব আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার। এ থেকে বোঝা যায় মেহরৌলি অঞ্চলটি কতটা বিস্তৃত ছিল।

পৃথ্বীরাজ চৌহানকে যুদ্ধে পরাজিত করেন মহম্মদ ঘোরী। তিনি পরবর্তীকালে আফগানিস্তান ফিরে যান ও তাঁর এক সেনাধ্যক্ষ কুতুবুদ্দিন আইবককে সমস্ত কিছুর দায়িত্ব দিয়ে যান। ১২০৬ সালে, মহম্মদ ঘোরীর মৃত্যুর পর, কুতুবুদ্দিন ক্ষমতা দখল করেন এবং দিল্লি সালতানাতের প্রথম সুলতান বলে নিজেকে ঘোষণা করেন । তাঁর এই সাম্রাজ্য মামলুক ডাইনেস্টি বা স্লেভ ডাইনেস্টি নামে বিখ্যাত হয়। উত্তর ভারতে এদের রাজ্যের বিস্তার হয় ও মেহরৌলি এই মামলুক ডাইনেস্টির রাজধানী হয়। ১২৯০ খ্রীষ্টাব্দ অব্দি, এই স্থানেই রাজধানী থাকে। খলজি রাজারা এর পরে সিরি নামক অন্য একটি ছোট্ট শহরের পত্তন করেন ও রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। লাল কোট দুর্গ বা কিল্লা রাই পিথোরার উল্লেখ আমরা প্রথম পাই ১৬ শতাব্দীর ঐতিহাসিক আবুল ফজলের বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে ।

এখান থেকে আমার পথ চলা শুরু হলো এক অটো চালকের সঙ্গে। কুতুব মিনার অতিক্রম করে, বাঁদিকের রাস্তা দিয়ে এগিযে চল্লাম মেহরৌলি অঞ্চলের ভেতরে। ডানদিকে প্রথমেই চোখে পড়লো বিখ্যাত সব ফ্যাশন ডিজাইনারদের বুটিক। কিছু দূর এগিয়ে ডানদিকে একটি রাস্তা চলে গেছে যোগমায়া মন্দিরের দিকে| শোনা যায়, প্রাচীন এই মন্দিরের প্রথম মেরামত করেন মুঘল সম্রাট আকবার শাহ এবং তাঁরই নির্দেশে লালা শেঠমল এই কাজটি সম্পূর্ণ করেন। মির্জা জাহাঙ্গীরকে যখন ইংরেজরা বন্দি করেন, সম্রাট বাহাদুর শাহর মা ও আকবর শাহর স্ত্রী পুত্রের মুক্তির জন্য মায়ের মন্দিরে মানত করেন। তিনি ফুলের তৈরি পাখা দিয়ে এই মন্দির ও কাছের কুতুবুদ্দিন কাকীর দরগা সাজিয়ে দেবেন। তাঁর সন্তান নির্বিঘ্নে ফিরে আসেন। সেই থেকে আজ অব্দি প্রতি অক্টোবর মাসে ‘ফুল ওয়ালী কি সৈর’ নামে একটি বিখ্যাত উৎসব হয়। স্থানীয় ফুলের কারিগরেরা বড়-বড় ফুল-পাখা তৈরি করেন। এক বিশাল শোভাযাত্রা যোগমায়ার মন্দির ও কুতুবুদ্দিন কাকীর দরগায় যায়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে, সবাই এই উৎসবে যোগ দেন।

এরপর অটো চালকটি একে-একে আমায় কুতুবুদ্দিন কাকীর দরগা, আজম খানের সমাধী, জাহাজ মহল, জাফর মহল, গন্ধক কি বাওলি, ছোটোমাটি মসজিদ, হজ-এ-শামসি ও ঝর্ণা দেখান। প্রতিটি জায়গার একটি করে গল্প আছে। সে কথা আমার অন্য চিঠিতে লিখবো।

সময় কম; এবার ফেরার পালা। বিকেলের পড়ন্ত আলোয়, অটো এবার মেহরৌলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পড়লো। কুতুব মেট্রো স্টেশন ও জামালী কামালী পার্কের পাশ দিয়ে চল্লাম কুতুব মিনারের গাড়ি পার্কিংয়ের কাছে। এক মুহূর্তে, প্রাচীন সভ্যতার জায়গা থেকে এসে পড়লাম দিল্লির অত্যাধুনিক রাস্তায়। ক্ষুদিত পাষাণের মতন, মেহরৌলি তখনও আমায় পেছন থেকে ডাকছে। মনে হলো, ইতিহাস এখনও কথা বলে| কিছুই হারায় না।

 

ভালো থেকো,

সংঘমিত্রা

 

(মূল রচনা – সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ )