‘প্রকাশ পর্ব’

For Sharing

প্রিয় মৈত্রী,

বাঙালির সুখ-দুঃখের চিরসাথি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানব চেতনার এমন কোনও স্থান নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথকে তোমার পাশে পাবে না। এমন কি যেখানে তোমার একান্ত আপন চির সঙ্গিনী ছায়া, লুকোচুরি খেলার অছিলায় তোমায় ছেড়ে লুকিয়ে পড়ে, তুমি তারে আর দেখতে পাওনা; কোনও অজানা ভয়ে শঙ্কিত তোমার মন যখন অশান্ত হয়ে ওঠে, তখনও তুমি তোমার পাশে রবীন্দ্রনাথকে পাবেই। তাঁর শব্দমধুর মায়াজালে তোমার মন কখন শান্ত হয়ে পড়েছে, তুমি তা বুঝতেও পারবে না। জীবন যুদ্ধে যখন তোমার সকল ইন্দ্রিয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, বহির্বিশ্বের সকল শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে, যখন তোমার ক্লান্ত শ্বাস-প্রশ্বাস তোমার কাছে প্রবলতর বলে মনে হয়, সেই সময়ও তুমি তোমার পাশে নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথকে পাবে, কখন যে তিনি এসে চুপটি করে তোমার হাত ধরে বসে আছে তুমি বুঝতেই পারবে না। তখন তোমার অজানা পথে পাড়ি দিতে আর ভয় হবে না, তখন তুমি ঈশ্বরের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পাবে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বগুরু, তাই আমাদের একটি মন্ত্র দিয়ে গেছেন ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান’। কথাটা বুঝলে মন্ত্র, নচেৎ কবিতা।

দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের দু’নম্বর মার্কেটে মাটির খুড়িতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভবেশদার রবীন্দ্র স্তুতি শুনছিলাম। ভবেশদাকে পেছনে অনেকে রবীন্দ্র পাগল বলে ডাকে। তবে আমরা ওনাকে রবীন্দ্র বিশারদ বলেই জানি। সেদিন ভবেশদা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটা ঘটনা শোনাচ্ছিলেন;  উনি বলেন, একজন রবীন্দ্র প্রেমীক রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশ এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত লেখার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে অনুরোধ করলেন, সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি জাতীয় সঙ্গীত লিখতে। তখন রবীন্দ্রনাথ মৃদু হেসে বলেছিলেন, আমি কি লিখব, গুরু নানাকজী তো কয়েকশো বছর আগেই তা লিখে গেছেন। এর থেকে সুন্দর লেখা আর হতে পারে না। চায়ের আড্ডা শেষ হলেও, ভবেশদার কথায় গুরু নানকজীর সেই লেখাটি পড়ার ইচ্ছে সুতীব্র হয়ে রইলো।

সৌভাগ্যবশত এখন ‘প্রকাশ পর্ব’, অর্থাৎ গুরু নানকের ৫৫০তম জন্মোত্‍সব উদযাপন হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। গুরুদ্বারা গুলিতে এখন সাজসাজ রব, রাজধানি দিল্লিও এর ব্যতিক্রম নয়। দিল্লির ঐতিহাসিক শীষগঞ্জ গুরুদ্বারা, রুকাবগঞ্জ গুরুদ্বারা, বাংলাসাহেব গুরুদ্বারার আলোক ছটায় আজ দিল্লি আলোকিত; আর হবে নাই বা কেন, ‘প্রকাশ পর্ব’ বলে কথা।

‘প্রকাশ পর্ব’ শিখ ধর্মের প্রবর্তক নানক দেবের জন্ম দিবস। নানকজীর জন্ম হয় ১৫ই এপ্রিল, ১৪৬৯ সালে কার্তিক পূর্নিমা তিথিতে, বর্তমান  পাকিস্তানের রাজধানী লাহোরের একটি ছোট্ট গ্রাম তালবন্দীতে। যা  নানকানা সাহিব নামে এখন পরিচিত।

ছোটোবেলা থেকেই নানকজির আধ্যাত্মিক বিষয়ে গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি সর্বদা ঈশ্বর আরাধনায় মগ্ন থাকতেন। গরিব-দুঃখী দেখলেই তাঁর মন ভারাক্রান্ত হয়ে যেত। তিনি যখন যা পারতেন সামর্থ অনুযায়ী সেবা করতেন। সবসময় তাঁর মন সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষদের  মঙ্গল চিন্তায় নিমগ্ন থাকতো। জাতি-ধর্ম-বর্ণ   র্বিশেষে  তাঁদেরনি সাহায্য ও কল্যাণ করাই ছিলো তাঁর জীবনের আসল উদ্দেশ্য। তিনি কিন্তু ‘এক ওঙ্কার’ অর্থাৎ এক ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।

ভারত ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ গুরু নানকের অমূল্য বাণী ও তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনকে আজ স্মরণ করছেন। আসলে গুরু তো তিনিই, যিনি অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে চলেন। জীবনযাপনের সঠিক পথ দেখিয়ে দেন। পবিত্র ও সৎভাবে বাঁচার প্রেরণা দেন। প্রকৃত গুরুর মতোই গুরু নানকও শিখিয়েছিলেন কিভাবে বদ্ধ সংসারেও মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর সেই বাণী, ‘ঈশ্বর আর মানুষ আলাদা নয়। মানুষকে ভালোবাসলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়।’

তিনি তাঁর সমকালীন সমাজের মহিলাদের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব দেখে আহত হয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, মন্দির বা মসজিদে তখন মেয়েদের ঢুকতে দেওয়া হতো না। তাই তিনি সেই সময় শিখ সম্প্রদায়ের মহিলাদের মন্দিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।

শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য গুরু নানক, তিনটি শপথ নিতে বলেছিলেন। বন্ধ চাকো, অর্থাৎ সকলের সঙ্গে মেলামেশা করো, কিরাত করো অর্থাৎ সৎ জীবনযাপন করো এবং নাম জপনা, অর্থাৎ ঈশ্বরের নাম জপো।

গুরু নানক তাঁর শিষ্যদের মানব সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার উপদেশ দিয়েছেন। বিশ্বের এমন কোনও স্থান নেই যেখানে দুঃস্থ  মানুষদের জন্য শিখ সম্প্রদায় লঙ্গরের ব্যবস্থা করে না। গুরদ্বারায় সকল জাতের মানুষের প্রবেশ অবাধ।

দিল্লি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমেটি পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। এই শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে একটি করে চারা গাছ রোপণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বছর শেষে তার মূল্যায়ন করে নম্বর দেবার ব্যবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত। সত্যি, ভাবতে অদ্ভুত লাগছে। প্রকৃতিকে বাঁচাবার এমন একটা অভিনব প্রচেষ্টা সত্যিই সাধুবাদের যোগ্য।

গুরু নানকদেবের প্রকাশ পর্বের মূল লক্ষ্যই হল – অন্ধকার দূর করে  জ্ঞানের আলোয় সমগ্র মানব জাতিকে আলোকিত করে তোলা। আজ এখানেই শেষ করছি।

ইতি

তোমার মিতা

(রচনা – শুভা রায় )