ঐক্যের কাণ্ডারি

For Sharing

১৯৪৬ থেকে ১৯৪৯, ভারতের এই তিনটি বছরের ইতিহাস বস্তুত আধুনিক ভারতের সবথেকে অস্থির, সবথেকে বেদনাদায়ক, সবথেকে সন্ত্রাসকবলিত, সবথেকে অমানবিক আর সবথেকে লড়াইয়ের সময় হিসাবেই পরিগণিত। দাঙ্গার ঘা শুকানোর আগেই ঝড়ের মতো এসেছিল দেশভাগ। কাশ্মীরে যুদ্ধ। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুকে নিয়ে দিশাহারা নতুন সরকার। তার সঙ্গে চলছে যেন এক রক্তের উৎসব। ক্ষমতা হস্তান্তর যখন নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ব্রিটিশ সরকার জানিয়ে দিল, আর এক বছর মাত্র। ১৯৪৮ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ শাসক ভারত ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু, তখনও জানা ছিল না যে দেশভাগ হবে কিনা। এমতাবস্থায় এখনও হাতে একটি আস্ত বছর আছে ধরে নিয়ে কিন্তু আচমকা ৩ জুন ১৯৪৭ সালে ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন একটি বৈঠক ডাকলেন এবং বললেন, আর মাত্র আট সপ্তাহ। ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ চলে যাবে এবং দেশভাগ হচ্ছেই। পরদিন ৪ঠা জুন সেটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও হয়ে গেল। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল অখণ্ড ভারতের। কোনও মানসিক, প্রশাসনিক প্রস্তুতিই ছিল না। লক্ষ লক্ষ মানুষ জানে না, তাঁদের দেশ কোনটা হবে? কারণ, দেশ কাটার কাঁচি ভারতের হাতে নেই। তার জন্য আসবেন একজন ব্রিটিশ। সিরিল র‌্যাডক্লিফ। দাঙ্গা বেড়ে গেল। উদ্বাস্তুর সমুদ্র আছড়ে পড়ছে প্রতিদিন। সেরকম এক মুহূর্তে চলছে সংবিধান রচনা। এবং গান্ধী হত্যা। ৩০শে জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে ওই খবরের পর রেডিওতে শান্তিরক্ষা করার আহ্বান জানাতে গিয়ে নেহরু কেঁদে ফেলেছিলেন। সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল নেহরুকে বলেছিলেন, আমাদের এবার সব বিভেদ ভুলে একজোট হয়ে বাপুর স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। ভারতীয় রাজনীতির এই সেরা রাজনৈতিক জুটি একজোট হয়ে সেই ১৯৪৮ সালে যখন শপথ নিলেন ভারতকে এক আধুনিক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে, তখন সব গুরুভার কাঁধে নিয়েছিলেন যিনি, তিনি আজও আধুনিক ভারতের ইতিহাসে লৌহপুরুষ হিসাবেই পরিগণিত। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল।

সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের জন্মদিবসকে ভারতে পালন করা হয় একতা দিবস হিসাবে। এই ঐক্যের বার্তার সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা কি নিছকই এক কর্তব্য পালন? নাকি সত্যিই এই দিবসটির সঙ্গে ঐক্যের বাণী যুক্ত হওয়ার মধ্যে রয়েছে এক গভীর তাৎপর্য? অবশ্যই তাই। বল্লভভাই প্যাটেল ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর সবথেকে কঠিন যে কাজটি তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, সেটি হল দেশীয় রাজাদের রাজ্যগুলিকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করার ব্রত। স্বাধীনতার ঠিক চার মাস পর এই দায়িত্ব তাঁর হস্তে অর্পণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। নেহরু জানতেন এই কঠিন কাজটি তাঁর গোটা মন্ত্রিসভায় একমাত্র একটি মানুষই পারবেন করতে। সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে প্যাটেল প্রথমেই গেলেন ওড়িষায়। তিনি ওড়িষার সমস্ত রাজাদের ডাকলেন। কথা বললেন প্রত্যেকের সঙ্গে। তাঁদের দীর্ঘ আলাপচারিতায় বোঝাতে সচেষ্ট হলেন যে স্বাধীন ভারতের সঙ্গে তাঁদের রাজ্যগুলি যদি সংযুক্ত হয়, তাহলে গড়ে উঠবে এক শক্তিশালী অখণ্ড ভারতবর্ষ। সর্দারের কথা দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যেক রাজা মন দিয়ে শুনলেন বটে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ কেউই কথা দিলেন না। তাঁরা একটু যেন দ্বিধান্বিত। সর্দার প্যাটেল বুঝলেন মনের কথা। তিনি জানেন, এই কাজটি আর যাইহোক জোর করে অথবা ভয় দেখিয়ে হবে না। কারণ দেশীয় রাজাদের একটি সম্মান রয়েছে। এতকালের রাজত্ব ও প্রজাদের উপর শাসনের অভ্যাস এক লহমায় ত্যাগ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি রাজাদের বললেন, আপনারা ব্যস্ত হবেন না। সময় নিন। বিবেচনা করুন। এখনই কিছু স্বাক্ষর করার দরকার নেই। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। আমি চললাম। সর্দার প্যাটেল ফিরে চললেন আবার দিল্লি। বৈঠকটি হয়েছিল কটকে। প্যাটেল কটক রেলওয়ে স্টেশনে এলেন এবং অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন ট্রেন আসবে। ট্রেন এসেও গেল। এখানে কয়লার ইঞ্জিন বদল হবে। তাই একটু সময় লাগতে পারে। নিজের কামরায় অপেক্ষা করছেন তিনি, আচমকা দেখা গেল দুই ব্যক্তি ছুটতে ছুটতে আসছে রেলওয়ে স্টেশনে। তাঁরা এসেই সোজা যখন দেখতে পেলেন ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে, দৌঁড়ে চলে এলেন প্যাটেলের কামরায়। বললেন, স্যার, আমাদের মহারাজারা বলছেন আপনাকে একঘণ্টা অপেক্ষা করতে। তাঁরা আসতে চান এখানে। প্যাটেল বললেন, তাহলে তো ট্রেন ছেড়ে দেবে। কি করা যায়! কিন্তু প্যাটেল ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ। তিনি এত বড় একটা দেশের কাজের জন্যও ট্রেন আটকে রেখে সাধারণ যাত্রীদের সমস্যায় ফেলতে চাইলেন না। নিজের সচিব ভি পি মেননকে বললেন, তুমি থেকে যাও। মহারাজাদের সঙ্গে কথা বলো। মেনন সেই কথা শুনে থেকে গেলেন। আর প্যাটেল বললেন সময় মতোই যেন ট্রেন ছাড়ে। সেদিনই রাতে ভি পি মেননের সঙ্গে আলোচনা করে মহারাজারা বলেছিলেন, তাঁরা ভারতেই যুক্ত হবেন।

সেই শুরু। এ ভাবেই একের পর এক দেশীয় রাজ্য যুক্ত হতে শুরু করল ভারতের সঙ্গে। এই নরম দেশীয় রাজাদের সঙ্গে যেমন নরম অবস্থান নিয়েই প্যাটেল তাঁদের রাজি করিয়েছিলেন, ঠিক উলটো অবস্থান নিতে হয়েছিল হায়দরাবাদ ও জুনাগড়ের ক্ষেত্রে। ওই দু’টি রাজ্য বেঁকে বসেছিল ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে। আর তখন সেই দুই নবাব দেখেছিলেন লৌহপুরুষকে। প্যাটেলের শান্ত অথচ কঠোর অবস্থানে তাঁরাও পরবর্তীকালে ভারতেই মিশে যান। ৩১ অক্টোবর আমরা পালন করলাম জাতীয় একতা দিবস। সত্যিই তো! এই মানুষটির নামের সঙ্গেই তো ঐক্য শব্দটি মানানসই। কারণ, স্বাধীন ভারতের জন্মলগ্নে তিনিই ছিলেন ঐক্যের প্রধান পুরোহিত!

(মূল রচনাসমৃদ্ধ দত্ত)