বাতাসে বাসুকির বাস

For Sharing

ক’দিন ধরে উৎকণ্ঠায় ‘বোকা বাক্স’র দিকে মুখ করে বসে থাকার পর আজ সেই অবস্থার অবসান হলো। খবরটা ছিল, ৮০ ফুট মাটির গভীরে একটি বাচ্চা প্রায় ১০০ ঘণ্টা যুদ্ধ করে আজ মৃত ঘোষিত হলো। বড় বেদনাদায়ক ইতি।

এই নিয়ে ‘বোর ওয়েল’-এ পড়ে গিয়ে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারালো। এমন আরো কত গর্ত কত জায়গায় অজানা  লুকিয়ে  আছে কে জানে। সম্ভবতঃ কেউ পড়ে না গেলে এবং পাড়া-প্রতিবেশীর আর্তনাদ শোনা না গেলে এসবের হদিশ পাওয়া যাবে না। যদিও সোশাল মিডিয়া আজ জাগ্রত।

একটা কথা জানতে বড় আগ্রহ হয়। মাটির অত গভীরে এত দীর্ঘ সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো অসুবিধা হয় কি? কে বলতে পারে। মাটির ওপরে শ্বাস-প্রশ্বাসের যা কষ্ট তার কথা দিল্লিবাসীর অজানা নয়। মাটির তলার অবস্থা কে বলতে পারে।

দিল্লি শহরে স্বাভাবিক অবস্থাতেই এখন শ্বাস প্রশ্বাসের অস্বাভাবিক কষ্ট। বলতে বাকি শ্বাস নেবেন না কারণ চারিদিকে দূষণের কারণে যে বিষ ছড়িয়ে রয়েছে তা ভয়ংকর।

তবে কি শুধু নিঃশ্বাস ছাড়বো, এটা সম্ভব নয়। তাছাড়া উচিতও নয়।

শুনেছি নাকি এ শহরের হাওয়া এমনিতেই ভালো। নষ্ট করছে পার্শ্ববর্তী রাজ্যের কৃষকরা। তারাই দায়ী। তারা নাকি চাষের ফসল তোলার পর অবশিষ্টাংশটা কি করবে ভেবে না পেয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আগুনের ধোঁয়া এদিক ওদিক ছড়িয়ে দিয়ে প্রাণ অতিষ্ট করে তুলছে। জ্বালিয়ে খেলে বটে আমাদের।

শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারের মধ্যে আলোচনা করে এ অবস্থার নিস্পত্তি হবে। যেহেতু সব রাজ্যেরই একথা জানা যে, তার পার্শ্ববর্তী রাজ্যের নাগরিক-মানে ভোটার-এ রাজ্যের কোনো উপকারে লাগে না। তাই নিশ্চিত রূপে তার দায়িত্বও আমাদের নয়।

দায়িত্ব সেই পাশের রাজ্যের। মানে যে রাজ্যের সে নাগরিক-ভোটার-তাই তো? তাহলে এ অবস্থায় আমার রাজ্যের হাওয়া তোমার রাজ্যে যদি হাওয়া বদলের কারণ হয় তার দায়িত্ব আমার থাকে না। দায়িত্ব হাওয়ায় ভাসছে। দুর্গতি পাশের রাজ্যের।

কষ্ট সবচেয়ে বেশি পায় শিশুরা তাই তার দায়িত্ব বর্তায় অভিভাবকদের ওপর। তোমার ঘরে বসে তোমার বাচ্চা কিভাবে শ্বাস প্রশ্বাস নেবে তা দেখার দায়িত্ব কি সরকারের? তার অন্য কাজ নেই। সরকারের কত জ্বালা, তার ওপরে পেছনে লেগেছে বায়ু দূষণ। যত্ত সব।

আজ কাগজ পড়ে বুঝলাম অন্যদিকের অবস্থা আরো সঙ্গীন।  সমুদ্রের জল নাকি বেড়ে যাচ্ছে তাই সমুদ্র পার্শ্ববর্তী এলাকায় ডাঙ্গায় জল চলে আসবে। সমুদ্র তটে আর কাছের শহরে অনেক পরিমানে জল বেড়ে যাবে এবং বছরে অন্ততঃ একবার প্লাবন হবে, বোঝো ব্যাপার। এতো সুকুমার রায়ের হ-য-ব-র-ল্ র হিজিবিজি বীজের কথা। সব জল ডাঙ্গায় চলে এলে কাদা হয়ে গিয়ে সবাই আছাড় খাবে। বায়ুতে দূষণ, পায়ের তলায় কাদা। এখন যাই কোথা। বাঁচোয়া শুধু এই সমুদ্রের জল দিল্লি পৌঁছতে নিশ্চয়ই  বেশ সময় লাগবে। তদ্দিন নিশ্চিন্তি। দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। কিন্তু কিছু একটা তো করতেই হবে।

সেদিন টেলিভিসনে দেখলাম নিঃশ্বাস নেওয়ার অপূর্ব এক কায়দা একজন শেখাচ্ছেন। জানিনা স্কুল পড়ুয়া বাচ্চারা এসব দেখার সুযোগ পায় কি না। মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঁ পায়ের তলা দিয়ে ডান হাত গলিয়ে-নাকি বাঁ হাত ছিল-নাকের একটা ফুটো বন্ধ করে দিয়ে অন্যটি দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। অবলিলাক্রমে। এবং নিজের পেটে নানা রকম মানচিত্র বানিয়ে চলেছেন। আশ্চর্য। ব্র্যাভো। বলতে ইচ্ছা হয় চালিয়ে যাও। ছোটোরা এ প্রক্রিয়া অনুশীলন করলেও বয়স্করা একপায়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন কি? তাঁদেরও তো অফিসের কাজ, বাড়ির কাজ ইত্যাদি আছে। তাছাড়া তাঁদের নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেই হবে। সময় কোথায়। কি জানি বাবা।

আর একবার ছোটবেলায় শুনেছিলাম যমুনার জলে উপরোক্ত ঐ একই ভাবে এক মহান ব্যক্তি দু দিন তিন রাত্রি দাঁড়িয়ে ছিলেন। দাঁড়িয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমতুল্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তখন অবশ্য যমুনার জল অত্যন্ত স্বচ্ছ-পরিস্কার হলেও পায়ের কাছে পিঠের জল কিছুটা হয়তো ঘোলা হয়েছিল। এবং বহু মানুষ এই লীলা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তবে তিনি এই কান্ড কেন করেছিলেন, তা আমার কাছে অজানা।

এখন সে যমুনাও নেই। আর ঐরকম ক্ষমতাবান মানুষও কম দেখা যায়।

এই সব চিন্তায় ঘুম আসে না রাতে। সকালে উঠলেই আবার নতুন খবরের কাগজে মন ভেঙ্গে দেওয়া সব নতুন খবরাখবর। তাই ভাবলাম সবার সাথে মনের অবস্থাটা একটু শেয়ার করে নিলে যদি সমাধান পাওয়া যায়।

ভালো থাকবেন। নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস নেবেন। (রচনা – নিশীথ রায়)