‘ফলেন পরিচয়েৎ’

For Sharing

সেদিন হঠাত্ পুরোনো বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে ‘লক্ষণ সেন’ নাটকটা হাতে এলো। প্রস্তাবনা অংশে পড়লাম ‘আম, কাঁঠাল, কদলি’ ইত্যাদি বৃক্ষে ফল ধরিয়াছে। অপর দিকে পুষ্পিত উদ্যানের একাংশ দেখা যাইতেছেঃ ধান্যের গোলা, বৎস দুগ্ধপান করিতেছে, কাটা ধান মাথায় লইয়া কৃষক রমণীগণ ইত্যাদি ইত্যাদি।

হঠাৎ কি জানি কেন মন চলে গেল নানান ফলের কথায়। লক্ষণ সেন থেকে মনে এলো – লছমন বলে যে ফলওয়ালা আমাদের চাঁদনিচকের বাড়িতে আম দিয়ে যেত, তার কথা। কোথা থেকে বেছে বেছে ‘বড়িয়া’ আম – খুব সুস্বাদু, নধর – ল্যাংড়া। সব সময় ল্যাংড়া তা তো নয়। কখনো দশেহরি আবার কখনো র‍্যাটল। আচ্ছা র‍্যাটল আম কি আজকাল দেখা যায়? অবশ্য কত নতুন নতুন আম বাজারে আসে। এখন তো আবার ম্যাঙ্গো ফেস্টিভালও হয়।

তা হোক গে। যে কথা বলছিলাম। লছমনের সঙ্গে বাড়ির বড়দের লুকোচুরি চলতো। ও আসতো তাদের নজর এড়িয়ে। তাঁরা ওর আনাগোনার খবর জানতেন শুধু নয়, ও না এলে ওর খোঁজে লোকও পাঠাতেন। আসলে আমগুলো খুব দারুণ হতো। দুটো-তিনটে বড় বড় আম প্রতি সন্ধ্যায় অবশ্যই জুটতো।

দিল্লিতে আম আসতো বেশি এলাহাবাদ থেকে। এখনো আসে। তবে এখন আসে আরও অনেক জায়গা থেকে। নানা জাতের। তবে মুম্বাই’এর আলফ্যানসো বা পশ্চিমবঙ্গের হিমসাগর আসে কম। তাদের শুনেছি শেলফ-লাইফ তত নয়।

আমের মতো খরমুজও শুধু গরমকালেই দেখা যেতো। পাতলা খোসার খরমুজ  আসতো এলাহাবাদ থেকে। এলাহাবাদ থেকে আসত পেয়ারাও। তার যেমন সাইজ, তেমনই জোরালো মনোহরা গন্ধও।

তরমুজ অবশ্য পাওয়া যেতো দিল্লির যমুনা তীরেই। দুপুরে বিরতির সময় দেখা যেতো অফিসের বাইরে লোকজন তরমুজ খাচ্ছে। কখনো সাইকেল থামিয়ে, কাটা তরমুজের এক ফালি খেয়ে রাস্তার ধারে খাওয়া তরমুজের মোটা খোসা ফেলে দিয়ে নির্বিকার চিত্তে সাইকেল চালাতে চালাতে চালক অদৃশ্য হয়ে যেতো। বাঙালি অবশ্য এভাবে  ফল খেতে অভ্যস্ত হয় নি দীর্ঘদিন। ফল খায় রুগীরা।

ফলের চাট দিল্লিতে খুব জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। সব ফল চাটের সঙ্গে যায় না। ধরুন- করমচা। দিল্লিতে খুব হয় তবে চাটে যায় না। আবার ধরুন পেয়ারা- বাব্বা! যায় না আবার,; খুব যায়। এখানকার ভাষায় ‘চলেগা নেহি দৌড়েগা’। সত্যি।

হ্যাঁ, এটাও সত্যি লিচু, পিচ, জাম ফলের চাটে একেবারেই বেমানান। মেড ফর ইচ আদার- অবশ্যই না।

একসময় ল্যুকট খুব দেখা যেত। একটু সোনালি দেখতে। দুটো অংশে ভাগ করা যায়। ভেতরের বীচিটা ফেলে দিতে হয়। জানি না, এখন দেখি না। পেঁপে বা পপিতা খুব জনপ্রিয়। আলাদাভাবে বা চাটে দিয়েও খাওয়া যায়। ডাক্তারদের সাপোর্ট আছে।

আচ্ছা, কেউ বলতে পারে মানুষ কাঁকড়ি কেন খায়? কি গুণ আছে এর মধ্যে? অবশ্য কাঁকড়ির সাপোর্টাররা তর্কের খাতিরে এ-টু-জেড ভিটামিনের উপস্থিতি কাঁকড়িতে দেখিয়ে দেবেন। তবে এর কুলিনতা নিয়ে আমার সন্দেহ সহজে দূর হবে না।

তবে স্কুল থেকে দুপুরে ফেরার পথে- তাও প্রায় ৫০ বছর আগে, যখন কাঁকড়ির পেট ছুঁড়ি দিয়ে কেটে মশলা আর লেবুর রস দিয়ে খাওয়া যেতো, তা লাগতো মন্দ না। তা মশলা বা লেবুর আকর্ষণ বেশি ছিল, না কাঁকড়ির তা আজ বলা মুশকিল।

যাক গে। ক’দিন আগে কার্জন রোডে- এখনকার কস্তুরবাগান্ধী মার্গ- এক জায়গায় দেখলাম ফলের চাটে আনারস দিচ্ছে। লোভ সামলানো গেল না। দাঁড়িয়ে গেলাম। হ্যাঁ, চলতে পারে।

আমার তাও মনে হল ফ্রুট স্যালাড উইথ আইসক্রিমে যেমন আনারস, আপেল, লিচু, আম, চেরি, আঙ্গুর ইত্যাদি শুধু চলতে পারে তাই নয়- এটা কাম্য। অন্য অনেক ফলের ক্ষেত্রে তা নয়। হ্যাঁ, তরমুজ বা খরমুজের টুকড়ো? তা চলতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ফ্রুট-স্যালাড কি দিল্লির সাহি ব্যাপারের মধ্যে পড়ে? এতো আধুনিক ইংরেজদের। তা হোক গে- তাতেই বা ক্ষতি কি? কি বলেন?

হ্যাঁ, মূল কথায় ফিরে আসা যাক। কথা হচ্ছিল দিল্লির রাস্তায় ফলের চাটের কথা। যেখানে আমের কথা হয়, সেখানে কি আমড়া বা আমলকীর কথা তোলা উচিত। জল আর জলপাই কি এক হল? বর আর বরকন্দাজ!

আজকাল দিল্লির বাঙালি অনেক ‘স্মার্ট’ হয়ে গেছে। তবে কি তারা দাঁতের জোর হারিয়েছে। কাউকে লম্বা আঁখ দাঁত দিয়ে খোসা ছাড়িয়ে খেতে দেখেছেন ইদানিং। না, দেখি না। দাঁতগুলো সব গেল কোথায়? এক সময় দিল্লীবাসীরা ঠেলাগাড়িতে বরফের ওপর কাটা আঁখের টুকড়ো সাজিয়ে রাস্তায় ফেরি করতো- চেঁচাতো- গন্ডেরি মে বালুশাহি কা মজা- বাঙালি অকারণে নিজেকে বঞ্চিত করেছে। একথা অবশ্য বলা যেত না, যদি দেখতাম- হ্যাঁ, সে ‘গন্নে কা রস’ খাচ্ছে। তাও সে খাবে না। কলেরার ভয়ে।

একসময় রেডফোর্টের উল্টো দিকের রাস্তায় পাতায় করে ‘ফালসা’ মশলা দিয়ে বিক্রি হতো। একআনা বা খুব বেশি হলে দু’আনায় বেশ খানিকটা ফালসা পাওয়া যেত। অবশ্য অতটা খেলে বাড়িতে জিভ লুকিয়ে রাখতে হত সন্ধ্যে অব্দি। হ্যাঁ, ইট ওয়াজ ওয়ার্থ। ফালসার রসও খুব লোভনীয়।

হ্যাঁ, এখন ভুট্টাও দিল্লীবাসী কাপে খায়। দু’হাত ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পোড়া ভুট্টা খাওয়া কম দেখা যায়। আমরা এখন ‘হেলথ কনশাস’। তবে জিভে স্বাদই না পেলাম তবে খেয়ে লাভ কি? দিল্লির রাস্তায় হাঁটলাম আর কুলফি, পানি কা বাতাসা বা ফুচকা, আলুর টিকিয়া, দহি ভল্লা যদি নাই খেলাম তো বাড়ি থেকে বেরোলাম কেন?

আর রইল ‘তলে হুয়ে আলু কে সাথ ফলো কি চাট’- খেলামই না তো দিল্লিতে করলাম কি? যাকগে সে সব কথা আর একদিন। পেট ভরে খেয়ো। ভালো থেকো।

(রচনা – বাদল রায় )