ব্রিক্স গোষ্ঠীর বাকি দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক 

For Sharing

ব্রাজিল,রাশিয়া,ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা-এই পাঁচটি  দেশকে নিয়ে ব্রিক্স গোষ্ঠী আত্মপ্রকাশের পর থেকে ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে এই গোষ্ঠীভূক্ত বাকি চারটি দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে নিয়েছে। পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে  আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই দেশগোষ্ঠীর গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্রাজিলের রাজধানী শহর ব্রাসিলিয়ায় সদ্য সম্পন্ন একাদশ ব্রিক্স শিখর সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অংশগ্রহণকে এরই প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রী মোদী, ব্রাজিল রওয়ানা হবার প্রাক্কালে সন্ত্রাসবাদের বিপদকে সম্মেলনের আলোচ্য সূচির অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় বলে উল্লেখ ক’রে  বলেছেন, সদস্য দেশগুলি এই বিপদের মোকাবিলায়  পারস্পরিক সহযোগিতা মজবুত করতে এই সম্মেলনে একটি অভিন্ন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আলোচনা করবেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ব্রিক্স ব্যবসায়িক পরিষদে তাঁর ভাষণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই দেশগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা সত্বেও ব্রিক্স দেশগুলি তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নী প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র সীমার ওপরে আনতে পেরেছে এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি আরও বলেন, এই গোষ্ঠীভূক্ত পাঁচটি দেশের মধ্যে পারস্পরিক  সহযোগিতা বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি দেশই অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রভূত লাভবান হয়েছে। শ্রী মোদি ভারতকে একটি অগ্রণী বিনিয়োগ বান্ধব দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন, এবং এ দেশে, বিশেষ ক’রে, পরিকাঠামো ক্ষেত্রে যথা সম্ভব অধিক পরিমাণে লগ্নীতে এগিয়ে আসতে ব্রিক্স ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতি আহ্বান জানান।  তিনি জানান, সদস্য দেশগুলিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে হবে, যেগুলিতে যৌথ উদ্যোগ স্থাপন করা যেতে পারে।

ব্রিক্স দেশ গোষ্ঠী এমন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ যেখানে সদস্য দেশগুলির শীর্ষ নেতাদের,  পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনার পর্যাপ্ত সুযোগ প্রদান করে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, প্রতিটি সম্মেলনেই সদস্য দেশগুলির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ে মত বিনিময় করেছেন, ও সেই অনুসারে ব্যবস্থা নিয়েছেন। এই ধারাকে বজায় রেখেই এই সম্মেলনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী  ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন  বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে শ্রী মোদী এক টুইট বার্তায় বলেছেন, তাঁদের মধ্যে বাণিজ্য,নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি সহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ কথা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারত-রুশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রতি ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈঠকে রুশ রাষ্ট্রপতি শ্রী মোদীকে রাশিয়ায় আগামী বছর মে মাসে নির্ধারিত বিজয় দিবস উৎসবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

একাদশ ব্রিক্স সম্মেলনের অবসরে শ্রী মোদী, চীনের রাষ্ট্রপতি শি চীন ফিং’এর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। গত এক মাসের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হল। গতমাসে তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে দুই নেতার মধ্যে দ্বিতীয় অ-আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমাগত মজবুত করার পন্থাপদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রপতি বলেন,  মামাল্লাপুরমে দ্বিতীয় অ-আনুষ্ঠানিক বৈঠকে তাঁকে যে আন্তরিকতার সঙ্গে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে, তাতে তিনি অত্যন্ত গর্ব অনুভব করছেন। তিনি আগামী বছর তাঁর দেশে নির্ধারিত তৃতীয় অ-আনুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদীকে আমন্ত্রণ জানান। দুই নেতা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয়ক উচ্চ স্তরীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির যত শীঘ্র সম্ভব বৈঠকের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেন। দুই নেতা ভারত-চীন সীমান্তে শান্তি ও সুস্থিতি বজায় রাখার ওপর আবার জোর দেন; এবং সীমান্ত প্রশ্নে দুই দেশের বিশেষ প্রতিনিধি স্তরে আর একটি বৈঠকের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।  বৈঠকে, BRICS, WTO ও RCEP’র মত আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত বিষয়গুলি নিয়েও তাঁরা আলোচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনা রাষ্ট্রপতি শি শিন ফিং আগামী বছর ভারত-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০-তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন। এই উৎসব দুটি দেশের মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার লক্ষ্যে এক তাৎপর্যপূর্ণ অবদান যোগাবে বলে দুই নেতা তাঁদের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।  (মূল রচনাঃ- ডঃ রূপ নারায়ণ দাস)