গোটাবায়া রাজাপাকসে শ্রীলংকার সপ্তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত

For Sharing

গত শনিবার শ্রীলংকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। শ্রীলংকা পোডুজানা পেরামুনা এস এল পি পির শ্রী গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৫২.২৫% ভোট। তিনি অনুরাধাপুরা শহরে শপথ নেবেন বলে ঘোষণা করেন। ভারতীয় প্রধান মন্ত্রী সহ অনেক বিশ্ব নেতা গোটাবায়া রাজাপাকসের জয়লাভে তাঁকে অভিনন্দন জানান।

শ্রী গোটাবায়া রাজাপাকসেকে দেওয়া বার্তায় প্রধানমন্ত্রী ভারত ও শ্রীলংকার মধ্যে সম্পর্ক আরো গভীর করার জন্য শ্রীলংকার নব নিরবাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। ভারতীয় জনগণ এবং তাঁর নিজের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আস্থা প্রকাশ করেন যে শ্রী রাজাপাকসের সক্ষম নেত্রীত্বে শ্রীলংকার জনগণ শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে এবং ভারত ও শ্রীলংকার মধ্যে সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং সভ্যতার সম্পর্ক আরো মজবুত হবে। প্রধানমন্ত্রী শ্রীলংকার নতুন সরকারের সঙ্গে এই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। শ্রী রাজাপাকসেও উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার কথা জানান।

ভারত উন্নয়নী এবং নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে শ্রীলংকার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। তবুও, মহিন্দা রাজাপাকসের দ্বিতীয় কার্যকালে ভারত-শ্রীলংকা সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। এই দ্বীপ রাষ্ট্রের ২০১৫-১৯ সময়কালে জাতীয় ঐক্য সরকারের সময় দুটি দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি হয়। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করার লক্ষ্যে ভারত ও শ্রীলংকা একাধিক সমঝোতা স্মারক পত্র স্বাক্ষর করে। অভ্যন্তরীণ বিরোধীতা এবং প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার জন্য এই সব সমঝোতা স্মারকপত্রের মধ্যে অনেকগুলির রুপায়ণ সম্ভব হয় নি। এখন এই সব চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শ্রী গোটাবায়া রাজাপাকসে  এবং তাঁর প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গীর ওপর।

শ্রীলংকায় ভারতীয় উন্নয়নী প্রকল্পগুলির রুপায়ণে বিলম্ব, শ্রীলংকায় চীনের কৌশলগত উপস্থিতি ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার মত বিভিন্ন প্রশ্ন ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে এবং  শ্রীলংকার তামিলদের বিষয়ে রাজনৈতিক আপোষরফার অভাবের দরুণ ভারত শ্রীলংকা সম্পর্কের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়েছে।

শ্রী গোটাবায়া রাজাপাকসের বিজয়ের ফলে তাঁর পরিবার সরকার পরিচালনায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয় হল নতুন প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির কিভাবে মোকাবিলা করে। এই প্রশাসনে রাজাপাকসের একাধিক ভাই থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। পেইচিং এর সঙ্গে রাজাপাকসের সম্পর্ক ঘনিষ্ট বলে মনে করা হয়। মহিন্দা রাজাপাকসে প্রশাসনের সময় শ্রীলংকা ভারতের উদ্বেগ নিরসনের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয় নি বলে দেখা গেছে। গোটাবায়া তখন প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন। তবে পরে রাজাপাকসেরা তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং ক্ষমতায়  এলে আগের ভুল সংশোধনের অঙ্গীকার করেন।

প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে গোটাবায়া রাজাপাকসে ২০০৫ থেকে ২০০৯ অবধিতে এল টি টি ইকে পরাস্থ করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘণের  এবং সিনহলা বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন ও সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপের অভিযোগ ওঠে। ২০১৯এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেখা গেছে যে শ্রীলংকার সংখ্যালঘু ভোটের একটা বড় অংশ পেয়েছে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিত প্রেমদাসা। তবে শ্রী গোটাবায়া রাজাপাকসে বলেছেন যে তিনি সমগ্র তামিলদের রাষ্ট্রপতি হবেন।

নির্বাচনী জয়ের পর তাঁর প্রথম ভাষণে গোটাবায়া বলেন যে তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি জোর দেবেন বিশেষ করে ইস্টার সানডে বোমা বর্ষনের পর অর্থনীতির ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়ে।  তামিল প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি হিসেবে গোটাবায়া রাজাপাকসের দৃষ্টিভঙ্গী কী হয় সে বিষয়ে ভারতে নজর রাখা হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, কারণ ভারত-শ্রীলংকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

গোটাবায়ার নেতৃত্বে নতুন দিল্লী এবং কলম্বোর মধ্যে নিরাপত্তার দিক থেকে মজবুত সম্পর্ক গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সর্ব ক্ষেত্রে দুটি সরকারের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহযোগিতা একান্ত আবশ্যক, তবেই ভারত-শ্রীলংকা সম্পর্ক আরো প্রগাঢ় হবে। অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে থাকে। তাই সংখ্যালঘু, মানবাধিকার এবং অন্যান্য আপোষরফার বিষয়গুলিতে গোটাবায়া রাজাপাকসের দৃষ্টিভঙ্গী ভারত-শ্রীলংকা সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে। গোটাবায়া প্রশাসনের সামঞ্জস্যপূর্ণ বিদেশনীতির ওপরেও  ভারত-শ্রীলংকা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে। (মূল রচনাঃ ড.গুলবিন সুলতানা)