সম্পর্কের অগ্রগতির লক্ষ্যে ভারত ও ভুটান

For Sharing

ভুটানের বিদেশ মন্ত্রী লিয়োনপো (ডঃ) টানডি দোরজির সপ্তাহব্যাপী ভারত সফর দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ডঃ দোরজি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক  করেন এবং ভারত-ভুটান সম্পর্কের সম্ভবনাগুলি খতিয়ে দেখেন। উভয়পক্ষের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা,  উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব এবং জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের সঙ্গেও ডঃ দোরজির বৈঠক হয়। ভুটানের বিদেশমন্ত্রীর এরপর বোধগয়া এবং রাজগীরও যাবেন। এরপর তাঁর কলকাতা যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন।

উল্লেখ্য, দুদেশের মধ্যে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের আদান প্রদানের অঙ্গ হিসেবেই ডঃ দোরজির চলতি সফর। গত ৭ই নভেম্বর ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং’এর নেতৃত্বে ড্রুক ন্যামরুপ শোগপা – DNT’র শাসনকালের একবছর পুর্তি উপলক্ষ্যে এই  সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বিশেষ করে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের উন্নয়নের লক্ষ্যে শেরিং সরকারকে একাধিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়। ভুটানের দ্বাদশ পরিকল্পনা অনুসারে যেখানে উন্নয়নকল্পে সরকারের ১৩ বিলিয়ন অর্থ প্রয়োজন, সেখানে বিদেশ মন্ত্রককে মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন বরাদ্দ করা হয়। ভুটান সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণের পরও ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ, বাণিজ্য ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক মন্দা ও বৈদেশিক বিনিয়োগের মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

ভারত ও ভুটানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের আদান প্রদানের ক্ষেত্রে এই সফর এক নতুন অধ্যায়ের সূচক। উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সদিচ্ছা এবং সমঝোতার এক অনন্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির থিম্পু সফরের চার মাস পর ভুটানের বিদেশ মন্ত্রী ভারত সফরে এলেন। ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ এই নীতির  আওতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্বভার গ্রহণের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ জয়শঙ্কর ভুটান সফর করেছিলেন। উল্লেখ্য, সেটা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ডঃ জয়শঙ্করের প্রথম বিদেশ সফর। ২০১৮’র ডিসেম্বর মাসে  ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিংএর ভারত সফরও ছিল তাঁর প্রথম ভারত সফর।

১৯৬৮ সালে ভারত ও ভুটানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল অন্যতম সফল একটি উদাহরণ। এই সম্পর্ক দাঁড়িয়ে ছিল পারস্পরিক আস্থা ও সমঝোতার ওপর। ১৯৪৯ সালে ভারত ও ভুটানের মধ্যে স্বাক্ষরিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অংশীদারিত্ব চুক্তি যা ২০০৭ সালে  পরিমার্জন করা হয়, সেটাই উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের মূল ভিত্তি। এই চুক্তি দুদেশের মধ্যে উন্মুক্ত সীমান্ত, নিরাপত্তা সহযোগিতা, দুদেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরো মজবুত  করার ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকর হয়েছে। অর্থনৈতিক বিকাশ, গণতন্ত্র এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উভয় দেশ সহযোগী হিসেবে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। উভয় দেশের  মধ্যে জলসম্পদ, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সহ একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সমঝোতা রয়েছে।

ভুটানে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা বর্তমানে দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের পর্যটকের মোট সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী। ভুটানের পর্যটন কর্তৃপক্ষ দেশের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নখাতে পর্যটকদের কাছ থেকে ফী বাবদ অর্থ আদায়ের বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করছে। এযাবৎ ভারতীয় পর্যটকদের এই অর্থ দিতে হতো না।

ডঃ দোরজির এই সফরের রাজনৈতিক এবং আঞ্চলিক গুরুত্ব রয়েছে। দুদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রসার ছাড়াও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো মজবুত করা এর অন্যতম লক্ষ্য  ছিল। উভয় দেশের বিদেশমন্ত্রী দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার করার লক্ষ্যে একাধিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁরা জলবায়ু পরিবর্তন, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক এবং দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ভারতের অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত বিষয়ও পর্যালোচনা করেন।

(মূল রচনাঃ ডঃ নিহার আর নায়ক)