রাজ্যসভার ২৫০তম অধিবেশন

For Sharing

সংসদের উচ্চ কক্ষ রাজ্যসভার ২৫০তম অধিবেশন এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ভারতের রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সাফল্যের ক্ষেত্রে এর ভূমিকাকে গৌরবান্বিত করার প্রয়োজন রয়েছে। ১৯৫২ সালে এর সূত্রপাতের পর থেকে দেশের স্বার্থ রক্ষায় এই কক্ষের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৫২ সালে হিন্দু বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ বিল  থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের মুসলিম মহিলা (বিবাহ সংক্রান্ত অধিকার সুরক্ষা) বিল এবং ২০১৯এর জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল পাসের মাধ্যমে ভারতের ঐতিহ্যপুর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখেছে।

রাজ্যসভার চেয়ারম্যান উপরাষ্ট্রপতি এম ভেংকাইয়া নাইডু সঠিকভাবেই বলেছেন যে বিভিন্ন সময়ে উচ্চ কক্ষ দেশের বিভিন্ন প্রয়োজন মিটিয়েছে এবং নানান চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছে।  তবে দেশের পূর্ণ সম্ভাবনার রুপায়নে আমাদের এখনও অনেক কিছু করতে হবে বলে উপরাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন।

১৯৫২ সালের ১৩ই মে প্রথম অধিবেশন  থেকে নিয়ে ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট ২৪৯তম অধিবেশন পর্যন্ত রাজ্যসভার মোট ৫,৪৬৬টি বৈঠক হয়েছে। এই সময়কালে ১০৮টি সংবিধান সংশোধনী বিল সহ ৩,৯১৭টি বিল পাস হয়েছে। গত ৬৭ বছরে ২০৮জন মহিলা এবং ১৩৭জন মনোনীত সদস্য সহ ২,২৮২জন এই সভার সদস্যপদ অলংকৃত করার সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু করে এই সভার যাত্রাপথ অর্থবহ।

তবে এই সভার গৌরব বাড়িয়েছে এর বিরামহীন প্রবাহমানতা। দেশের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থায়, লোকসভা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দ্বারা তার আগেই ভঙ্গ করা হয় কিন্তু রাজ্যসভার জীবনকাল বিরমহীন  এবং অব্যাহত থাকে।

সভার ২৫০তম চলতি অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যথার্থই বলেছেন যে রাজ্য সভা ভারতের বৈচিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে এবং দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিফলন এতে পাওয়া যায়।

সংবিধানে যেমন উল্লেখ আছে এই সভা দেশের আর্থ-সামাজিক রুপান্তরের অবিচ্ছেদ্য অংগ। গত ছয় দশকের বেশি সময় ধরে এই সভা দেশ নির্মাণের কাজে অবদান জুগিয়ে আসছে। দারিদ্র দূরীকরণ হোক, নিরক্ষরতা, রোগব্যধি, কর্মহীনতা, সন্ত্রাসবাদ, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্যা হোক বা জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণ জনিত সমস্যার মোকাবিলা হোক, রাজ্যসভার গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকাকে খাটো করে দেখা যাবে না।

সাম্প্রতিক অতীতে পণ্য ও পরিষেবা কর, তিন তালাক, উঁচু জাতির অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল মানুষের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণ এবং অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ করার মত গুরুত্বপুর্ণ বিল রাজ্যসভায় গৃহীত হয়। অনুচ্ছেদ  ৩৭০ প্রসঙ্গে রাজ্যসভায় প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক। তিনি বলেন, এই সভার প্রথম নেতা এন গোপালস্বামী আয়াঙ্গার রাজ্যসভায় জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন অনুচ্ছেদ ৩৭০ উত্থাপন করেছিলেন। কয়েক দশক পর এই বিতর্কিত অনুচ্ছেদ রাজ্য সভাতেই রদ করা হয়।

রাজ্য সভার আরো একটি গোরব গাথা রয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে এই সভার প্রতি সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিভাবান নাগরিকরা আকৃষ্ট হয়েছেন। ভারতীয় সংবিধানের জনক, ড. ভীমরাও আম্বেদকার দুবার রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। শিল্পকলা, বিজ্ঞান এবং ক্রীড়ার মত বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রবীনরা রাজ্য সভায় আসার ফলে উপকৃত হয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তাদের উপস্থিতি এই সভার গুণমান বাড়িয়েছে এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিতর্কের মান বারিয়েছে। এছাড়াও উচ্চ কক্ষের সামগ্রিক কাজকর্মে উৎসাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধি করেছে।

প্রধানমন্ত্রী ২০০৩ সালে রাজ্যসভার ২০০তম অধিবেশনে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন যে  আমাদের দ্বিতীয় কক্ষকে কারো  দ্বিতীয় স্তরের কক্ষ বলে ভুল করা উচিত নয়।  বাস্তবে এই কক্ষে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিল্পী, বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং অন্যান্যরা সহ উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি কেবল দেশের গণতান্ত্রিক আদর্শকে সম্বৃদ্ধ করে নি, জাতীয় গুরুত্বের লক্ষ্যকে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেছে।

ভারতীয় সংসদের উচ্চ কক্ষ রাজ্যসভার উল্লেখযোগ্য  এই উদযাপন এমন একটা মূহুর্তে ঘটছে যখন দ্বিসভা বিশিষ্ট ব্যবস্থা এবং উচ্চ কক্ষের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তাই রাজ্যসভার ঐতিহ্য ভারতীয় হিসেবে আমাদের গৌরব বৃদ্ধি করে এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।  (মূল রচনাঃ শংকর কুমার)