বাতাসের বিষ

For Sharing

প্রিয় ‌ঋজু

হাজারিবাগ থেকে টুটিলাওয়া যাওয়ার পথে যে গোন্দা বাঁধে আমরা সাইকেল থামিয়ে খুব জোরে নিঃশ্বাস নিতাম, সেই বাতাসের শুদ্ধতা কী আজও একইরকম আছে? তোমার মনে আছে, করণপুরার টাঁড় আর পানুয়ান্না টাঁড়ের পশ্চিম দিগন্ত থেকে ঠিক বিকেল শেষ হলেই একটা ঠাণ্ডা বাতাস আসতো। সেই বাতাসে মিশে যেত কাঁচপোকা উড়ে যাওয়ার শব্দ। তখন আমাদের মুখে কথা ছিল না। ছিল শুধু নৈঃশব্দ। সেই বাতাসের গন্ধ আজও হয়ত ফুসফুসের কোনও এক গহীন কামরায় অবশিষ্ট আছে। তবে সে আরও নীরব হয়ে গিয়েছে বিগত ১৪ বছরে। বোকারো নদী ছাড়িয়ে অনেক দূরের গ্রামগুলির দিগন্তে যে জলপাই রঙের জঙ্গল থেকে হেমন্তের দুপুরে জিরহুলের গন্ধ ভেসে আসত, সেই তীব্রতার স্মৃতি এতদিন বুকে নিয়ে বেঁচে আছি। তবে, এবার হয়ত এই স্মৃতিদের দমবন্ধ লাগছে। হাজারিবাগের সেইসব দিনগুলি আজ আমার কাছে  অতীত নয়। ঠিক যেন পূর্বজন্ম। সত্যিই কী সেই গোন্দা বাঁধের বাতাস এই জগতে কখনও ছিল? সত্যিই কী কোজাগরীর চাঁদ ওঠার দিন জঙ্গল থেকে করৌঞ্জ তেল মাখা আদিবাসী মেয়েগুলি ঠিক বিশুদ্ধ হাওয়ার মতোই দলে দলে ফিরেছিল মহুয়ার হাটে? ঋজু, আজ তোমার নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে, এই চিঠিতে এতবার বাতাসের উত্থাপন কেন? কেনই বা বারংবার ফিরে আসছে হাওয়ার শুদ্ধতার আকুতি প্রসঙ্গ? তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে কখনও বিষণ্ণ হইনি। আজ হচ্ছি। এ বড় বিষাদের সময়। তুমি জানো আমার প্রিয় ঋতু হেমন্ত। আমাদের সেই আলোকোজ্জ্বল দিনগুলিতে কখন শীতকাল আসবে, আমরা অপেক্ষা করিনি কখনও। দীপাবলীর আলো নক্ষত্রলোকে মিশে যাওয়ার পরই যখন পরীক্ষার আতঙ্ক জমা হত প্রতিটি হৃদয়ে, তখনই সেই অন্তহীন পরীক্ষাপ্রস্তুতির বন্ধ দরজার মধ্যে ঢুকে যাওয়ার আগে আমরা চলে যেতাম তিলাইয়া বাঁধে পিকনিক করতে। সেই যাওয়ার সবথেকে আনন্দময় অনুভূতি ছিল ছাতিমের অবিরত কোলাহল। সুধন্যকাকুর জিপে চেপে সন্ধ্যার অন্ধকারে ফেরার পথে সারাদিনের হইচই আর ক্লান্তিগুলি যেন অবগাহন করত সেই ছাতিমগন্ধের ঝরণাধারায়। হেমন্ত বিষাদের কাল। বিকেল হলেই মন কেমন গ্রাস করত। কিন্তু সেই বিষাদবাতাসে মিশে থাকত আসলে মন ভালো হওয়ার মন্ত্রও। কারণ সে বাতাসে ছিল না সামান্য ফাঁকি। ছিল শুদ্ধতা। আজ সেই হেমন্ত কেমন যেন অচেনা হয়ে গিয়েছে ঋজু।  দেশের রাজধানী এই দিল্লি শহরে আছে অনেক গাছ। রয়েছে আরাবল্লী পাহাড়। এখনও রয়েছে পথচলতি সবুজ জঙ্গল। হ্যাঁ। শহরের কেন্দ্রস্থলেও  পাওয়া যায় সেই অরণ্যের আভাস। কিন্তু এই সবুজকে হারিয়ে দিয়েছে এ শহরের বাতাসের দূষণ। প্রতি বছর হেমন্ত এলে এ শহরের আনাচে কানাচে উড়ে বেড়ায় অনেক ছাতিমের গন্ধ।  আজও ইচ্ছা করে চোখ বন্ধ করে ফিরি যেতে সেই গোন্দা বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে শ্বাস নেওয়ার স্মৃতির মধ্যে। কিন্তু, মুহূর্তে ভুল ভাঙে। এ বাতাসে শুদ্ধতা মৃত। এ বাতাসে মৃত্যুর হাতছানি। অক্টোবর মাস থেকেই দিল্লির আকাশ ঢেকে যায় দূষণের চাঁদোয়ায়। নাকে ওঠে মাস্ক। বুকে বাসা বাঁধে ব্রংকাল ইনফেকশন। আর ডাক্তারদের ক্লিনিকগুলি থেকে ভেসে আসে নিবুলা‌ইজার, পাফ এবং স্টিম নেওয়ার উপদেশ। এ শহর এতকাল শুধু গরমে আগ্রহ নিয়ে সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রেখেছে আজ কত ডিগ্রি তাপমাত্রা হল তা দেখে আরও বেশি করে কুলারের মধ্যে ঢুকে পড়ার তাড়নায়। ঠিক সেইভাবেই শীতকালে চর্চা ছিল আজ সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কত ছিল সেই কাঁপুনি মিশ্রিত প্রশ্নে। আজ কিন্তু সময় বদলে গিয়েছে।  আজ সারা বছর ধরেই নাডাচাড়া করতে হয় কয়েকটি পদার্থ বিজ্ঞানের শব্দ নিয়ে। সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটারস,  কার্বন, সালফেট ইত্যাদি। হেমন্তের বাতাসে বিষাদ জড়িয়ে, এটাই জেনে এসেছি আবহমান। আজ কিন্তু দেশের সবথেকে উজ্জ্বল আর উন্নাসিক রাজধানী শহরের ধ্রুবপদ অন্য। সে জানে হেমন্তের বিষণ্ণতা আবেগময় নয়। সে বিষাদের উৎস নিরন্তর এক শ্বাসরুদ্ধকারী দূষণ।   হেমন্তে মিশেছে বিষ! জীবন আমায় এ কোথায় নিয়ে এল ঋজু!

তুমি ভালো থেকো,

আজ এখানেই শেষ করছি,

ইতি কৃষ্ণচূড়া।

(রচনা – সমৃদ্ধ দত্ত )