পাকিস্তানের মানুষ ইমরান খান সরকারের বঞ্চনার শিকার

For Sharing

বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তানে গত এক মাসে রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বহীন বেশ কিছু মজার ঘটনা নিয়ে তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পাকিস্তানে মৌলানা ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে “আজাদি মার্চ” নিয়ে পুরো এক মাস ধরে রাজনৈতিক মহলে তর্জা জমে উঠেছে। এ ছাড়াও, দেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী অসুস্থ নওয়াজ শরীফকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাবার অনুমতি দেওয়া উচিত হবে কিনা তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল সরগরম  হয়ে উঠেছে । লক্ষ্য করার বিষয়, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকৃত উদ্বেগের বিষয়গুলির ওপর আলোচনার পরিবর্তে এই দুটি প্রসঙ্গ  সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদের শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, ফজলুর রহমানের তথাকথিত আজাদি মার্চ শুরু হয় সুকুর থেকে গত ২৭’এ অক্টোবর ও কয়েকদিন পর তা ইসলামাবাদে পৌঁছয়। মৌলানার কথায়, ইমরান সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যেই এই মার্চের আয়োজন করা হয়। এই ঘটনায়  পাকিস্তানে ব্যাপক মাত্রায় হিংসা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে বলে দেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ আশংকা ব্যক্ত করে। এদিকে সরকার পক্ষ, ফজলুর রহমানের হুমকির বিরুদ্ধে প্রথম প্রথম কঠোর মনোভাব দেখালেও শেষ পর্যন্ত  রহমান ও তাকে প্রচ্ছন্ন সমর্থনকারী বিরোধী পক্ষের কয়েকজন নেতার সঙ্গে  যোগাযোগ স্থাপন করে। মৌলানাও তার সরকার বিরোধী কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে তার সমর্থকদের দেশের ছোট ছোট শহরে মিছিল ও সমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে ইমরান খান সরকারের নানা ব্যর্থতা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার নির্দেশ দেয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা, সমগ্র ঘটনা ক্রমে দেশের সেনা বাহিনীর প্রচ্ছন্ন হাত থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

পাকিস্তানে মৌলানার আজাদি মার্চ’কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই অসুস্থ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবার অনুমতি দানের  প্রশ্নটি সংবাদ মাধ্যমে আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। একাধিক দুর্নীতি মামলার মধ্যে একটিতে দোষী প্রমাণিত ও সাত বছর কারাবাসের সাজাপ্রাপ্ত নওয়াজ শরিফ হৃদযন্ত্রের অসুখে ভুগছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর আশু চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানিয়ে লাহোর হাইকোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করা সত্বেও ইমরান খানের PTI সরকার প্রথম কিছু দিন টালবাহানার পর শেষ পর্যন্ত সাতশো কোটি টাকার বন্ডের বিনিময়ে মাত্র একবারই চার সপ্তাহের জন্য বিদেশ যাবার অনুমতি দেয়। তবে নওয়াজ শরিফের দল- PML-N, প্রত্যাশা মতই সরকারের দেওয়া এই সুযোগ নিতে অস্বীকার করে। এবার লাহোর হাই কোর্ট হস্তক্ষেপ করেন এবং নওয়াজ শরীফকে বিদেশে যাবার অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি নির্দেশ জারি করেন। শেষ পর্যন্ত নওয়াজ শরীফ এ মাসের ২০ তারিখে কাতার বিমান সংস্থার একটি বিমানে চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেছেন। কোনো কোনো মহল এই ঘটনাতেও দেশের সেনা বাহিনীর হাত থাকার সম্ভাবনা আন্দাজ করেছে।  তাদের বক্তব্য, সেনা বাহিনীর ইশারাতেই ইমরান খান সরকার তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে শেষ পর্যন্ত নওয়াজ শরীফকে বিদেশে যাবার অনুমতি  দিয়েছে। নওয়াজ শরিফকে বিদেশে যাবার অনুমতি দানের প্রসঙ্গে ইমরান খান সরকার প্রথমে কেন কঠোর অবস্থান নেয়, তার বাখ্যা করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইমরান খান   আন্তর্জাতিক দুনিয়াকে দেখাতে চেয়েছিলেন, তিনি, তাঁর ভাষায় যে নয়া পাকিস্তান-রিয়াসত-এ-মদিনা গঠন করতে চেয়েছেন, সেই পাকিস্তানে দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কোনও মানুষকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুযোগ সুবিধা দেওয়া নীতিগত দিক থেকে আদৌ বাঞ্ছনীয় নয়। তবে নাটকের এখানেই শেষ নয়। ইমরান খান শেষ পর্যন্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশে যাবার অনুমতি দিতে বাধ্য হবার পর এর জন্য বিচার বিভাগকেই কাঠগোড়ায় দাঁড় করান, যার জন্য তাঁকে দেশের প্রধান বিচারপতির ভর্ৎসনা সহ্য করতে হয়।

এটা এখন সকল মহলের কাছেই স্পষ্ট যে, পাকিস্তান সরকার দেশের আসল সমস্যা থেকে  জনগণের দৃষ্টি ফেরাতেই এই সব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাতামাতি করছে। দেশের অর্থব্যবস্থা প্রায় বিপর্যস্ত। মুদ্রাস্ফীতি লাগামছাড়া। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাতন্ত্র বলতে প্রায় কিছুই নেই। এই পরিস্থিতিতে দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের ওপর সেনা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বাড়ছে। আর এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। (মূল রচনাঃ- ডঃ অশোক বেহুরিয়া)