জেনারেল বাজোয়ার কার্যকালের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক

For Sharing

সেনা প্রধান জেনারেল কমর জাভেদ বাজোয়ার কার্যকালের মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়াতে ১৯শে আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জারী করা নোট গত মঙ্গলবার বাতিল ক’রে সুপ্রীম কোর্ট এক অচিরাচরিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। ৫৯ বছর বয়স্ক জেনারেলের গতকাল মধ্য রাত্রে অবসর নেওয়ার কথা ছিল, তবে তিনি শর্তাধীনে ছ’মাস অতিরিক্ত সময় পেয়েছেন। এই বিষয়ে সংসদে আইন পাসের শর্তাধীনে ছ’মাসের এই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে দেশে বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং সুপ্রীম কোর্টে আইনী লড়াইও দেখা যাচ্ছে। প্রধান বিচারপতি আসিফ সাঈদ খোসারের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চ আইন এবং প্রশাসনিক দৃষ্টিতে এই অবস্থান গ্রহণ করেন। বেঞ্চ মনে করে সমস্ত প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ এবং এর ফলে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং রাষ্ট্রপতি আরিফ আল্ভি উভয়েরই অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়। আদালত উল্লেখ করেন যে প্রথমে এই প্রস্তাব মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত হওয়া উচিত ছিল। কেবল তার পরেই প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সংবাদ সংস্থার খবরে প্রকাশ যে ২৫জনের মধ্যে কেবল ১১জন মন্ত্রী প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছেন। আদালত আরো জানায় যে সামরিক নিয়মে “মেয়াদ বাড়ানোর’ উল্লেখ নেই এবং সেনা প্রধানের কার্যকালের বিষয়ে কোথাও কোনো রকম উল্লেখ নেই।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দ্রুত প্রয়াস নিয়ে ইমরান খান এক জরূরী ক্যাবিনেট বৈঠক ডাকেন এবং তাঁর প্রথম নোট প্রত্যাহার করে নেন। তারপর মেয়াদ বাড়ানো শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করে পাকিস্তানের ডিফেন্স সার্ভিস রুল সংশোধনের পর নতুন নোট জারী করেন। সরকার জেনারেল বাজোয়ার কার্যকালের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ হিসেবে “আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ”এই কথাটি উল্লেখ করেন। কিন্তু ৩ বছরের পূর্ণ কার্যকালের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য এটি কি আসল কারণ হতে পারে।

এর আগে কখনও পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট দেশের সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে এই ধরণের সিদ্ধান্ত নেয় নি। অসামরিক সরকারের ব্যর্থতার দরুণ সেনা বাহিনীর হস্তক্ষেপ জরুরী এই অজুহাত দেখিয়ে অতীতে  সুপ্রীমকোর্ট বারংবার দেশে সামরিক অভ্যুত্থান অনুমোদন করেছে মাত্র। ৯/১১র পর পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট কেবলমাত্র জেনারেল মুশারফের সংবিধান বহির্ভুত কার্যকলাপ অনুমোদনই করেন নি বরং নির্বাচন করানো এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য তাকে তিন বছর সময়ও দিয়েছিলেন। সেই কারণে পাকিস্তানের অস্তিত্বের অর্ধ সময়ের বেশি সময়কাল শক্তিশালী সেনা বাহিনী পাকিস্তান শাসন করে এবং নিরাপত্তা ও বৈদেশিক বিষয়ে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে।

আদালতের রায়ের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল এই বিজ্ঞপ্তি বাতিল কি বার্তা দিল সেটি। আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে অতীতে পাঁচ বা ছ’জন জেনারেল তাদের কার্যকালের মেয়াদ সম্প্রসারণ করেছেন। সে বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আদালত বলেছে এর পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।

বৈধ অবৈধতার প্রশ্ন ছেড়ে দিলেও, পর্যবেক্ষকরা  বিষ্ময় প্রকাশ করেন যে সম্প্রতি দুজন বিচারকের বিরুদ্ধে হিসেব বহির্ভুত সম্পত্তির মামলায় রাষ্ট্রপতির উল্লেখের ঘটনার প্রতিশোধ মূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা  নেওয়া হয়েছে কি না। আইনী সম্প্রদায় বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপে অসন্তুষ্ট বলেই মনে হয়। পাকিস্তানের বার কাউন্সিল আগামী সপ্তাহে কার্যকালের মেয়াদ সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। অনেক রাজনৈতিক দলও কার্যকালের মেয়াদ বাড়ানোর বিরোধিতা করছে। উল্লেখ করা যায় যে,  ৫ই ডিসেম্বর থেকে জেনারেল মুসারফের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলার দৈনন্দিন ভিত্তিতে শুনানী বিশেষ আদালতে শুরু হচ্ছে।

অনেকেই মনে করছেন ইমরান খান সরকার সেনা বাহিনীর হাতে বিকিয়ে গেছে সেই কারণেই এই সব ঘটনা ঘটছে। তারা বলছে জেনারেল বাজোয়ার কার্যকালের মেয়াদ  তিন বছরের জন্য বাড়ানো সেনা বাহিনীকে ইমরান খানের উৎকোচ প্রদান ছাড়া আর কিছুই নয়। সুপ্রিম কোর্টের আদেশের কয়েক ঘন্টার মধ্যে আইন মন্ত্রী ফারোগ নাসিম তার পদ থেকে ইস্তফা দেন। আদালতে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই এই পদত্যাগ। দেশের সমস্যা সমাধানে সরকার যে কতটা অজ্ঞ এই ঘটনায় তা পরিস্কার হয়ে যায়। জেনারেল বাজোয়ার মেয়াদ বাড়ানোর বিরুদ্ধে পেশোয়ার হাই কোর্টে একটি আবেদন দায়ের করা হয়েছে। এতে কারণ দেখানো হয়েছে যে জেনারেল বাজোয়া একজন আহমেদি অর্থাৎ ইসলামের এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত, যাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে অমুসলিম বলে অনেক অত্যাচার করা হয়েছে। আদালত এই বিষয়ে কি মতামত গ্রহণ করা করে এখন সেটি দেখার বিষয়।  (মূল রচনাঃ অশোক হান্ডু)