খিড়কি মসজিদ

For Sharing

শ্রীচরনেষু

বাবা,

একাকীত্বের কি কোন বিপরীত শব্দ আছে? বেশ কিছুদিন ধরে এই শব্দের সঙ্গে বাস করছি। খুঁজছি বিপরীত শব্দটিকে। এখনও পেলাম না। ইংরেজিতে Loanliness শব্দটার কোন বিপরীত শব্দ নেই। বহুর মধ্যে থাকাও একাকীত্বের বিপরীত নয়। বহুর মধ্যে থেকেও মানুষ একা থাকতে পারে। এই যেমন দিল্লির লুকোনো ঐশ্বর্য আবিষ্কার করতে বেড়িয়েছি তোমার জন্য। তোমার পুত্র হরিদাস তোমার জন্য এখন মার্কোপোলো, ফা হিয়েন বা আল বেরুনির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমি ভূপর্যটক  কিন্তু হারানো ইতিহাসের সাম্রাজ্যের।  যেমন এই মুহূর্তে আমি খিড়কি মসজিদে। এটা দিল্লির সাকেত এলাকা। এখন তো এর পাশেই সাকেত মল। জনারণ্য। এত মানুষের মধ্যে থেকেও তো আমি একাকী। বহুর মধ্যে থেকেও আমি একা। Lonely।  একাকীত্ব মানেই যদি বেদনা হত,  তাহলে Happiness বা সুখ হত  Loanliness বা একাকীত্বের বিপরীত শব্দ। কিন্তু তাতো হয় না।

খিড়কি মসজিদ সপ্তম শতাব্দীর মসজিদ। তুঘলক যুগের এক অসাধারণ স্থাপত্য। মহম্মদ বিন তুঘলকের নতুন রাজধানী শহর ছিল এটি। পুরনো জাহাঁপনা শহরের অধিকাংশই আজ হারিয়ে গেছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে। বাবা, এ এক অন্য জগৎ। খিড়কি মসজিদের সুউচ্চ প্রাচীর। কি অপূর্ব নির্মাণ। জানালাগুলো অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজের মত। এলাকার নাম খিড়কি গ্রাম। খুব ঘিঞ্জি।  অটো রিক্সার বিশৃঙ্খলা, হর্নের শব্দ। অলিগলি দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় এক নির্জন একাকী মসজিদ। খিড়কি মসজিদ। মসজিদের চারদিকে নিরাপত্তার বেড়া।

এতো মসজিদ নয়, যেন একটা দূর্গ। ১৩৫০ সালে যখন এটি নির্মাণ হয়, তখন তুঘলক শাসন। দিল্লিতে মোঘলরা তখন ঘনঘন আক্রমণ করছে। নিরাপত্তার চূড়ান্ত অভাব। হয়ত সেই কারণেই মসজিদও তৈরি হয়েছিল দূর্গের মত করে।

মসজিদের মধ্যে যেই প্রবেশ করলাম মনে হল, এ যেন এক মায়াবী রৌদ্রছায়ার জগৎ। প্রাসাদের ভেতর অন্ধকার এক মায়া জগৎ। এখানে মসজিদের ভেতরে সমান মাপের নানা স্তম্ভ রয়েছে। যাকে আমরা বলি পিলার। চারদিকে জালি দেওয়া পাথরের জানালা। পাথর কেটে কেটে সুদৃশ্য জালি তৈরি করা এক অসাধারণ শিল্প কলা।  দুদিকের স্তম্ভ উপরে অর্ধবৃত্তাকার আর্চ দিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখেছে।

এখানকার মানুষ অনেকে একে খিড়কি কিলাও বলে। জানো বাবা, আমি যখন এই কর্মব্যস্ত গ্রামের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলাম, দেখছিলাম সবাই ব্যস্ত। গা ঘেষাঘেষি করা বাড়ি। ছোট্ট একটা মাঠে শীতের রোদ্দুরে বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছে। কত দোকান। এরই মধ্যে অত্যাধুনিক বিউটি পার্লার। ভাবছি এই এলাকায় তখন মোঘলরা ঘনঘন আক্রমণ করছে। কত যুদ্ধ। কত মানুষের মৃত্যু। আলাউদ্দিন খিলজি মোঘলদের অত্যাচার, ঘনঘন আক্রমণ আর লুটতরাজে বিরক্ত হয়ে দিল্লির চারদিকে প্রাচীর তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন খিলজি বংশের সম্রাট। এখনও দিল্লির সিরি ফোর্ট-খেলগাও মার্গে গেলে সেই  ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। তবে আক্রমণ তারপরেও থামে নি। ১৩৯৮ সালের এরকমই এক শীতকালে আক্রমণ করেছিল তৈমুর। ১২০০ থেকে ১৩০০-এই দীর্ঘ সময়  মোঘলদের আক্রমণে সুলতানরা বিপর্যস্ত । আমীর খসরুর কবিতায় এই মোঘলদের বর্ণনাও ছিল ভয়াবহ।  তিনি লিখেছিলেন, মোঘলরা যেন ঈশ্বরের দয়াহীনতার শিকার। এরপর বাবর এসে মোঘলদের আক্রমণ বন্ধ করতে সক্ষম হন। বাবর ছিলেন মোক্ষম শাসক। তিনি তো ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের রচয়িতা।

বাবা, এই দিল্লির শরীরে কত প্রাচীন, কত অজানা ইতিহাস রয়েছে। দিল্লিতে বনিক সম্প্রদায় তো খুবই শক্তিশালী। রাজস্থান ও দিল্লির প্রাচীন আরবল্লি পর্বতমালার গা ঘেঁষেই ছিল রাজা অগ্রসেনের বাওলি। হেলি রোড আর হেলি লেনে কতবার এসেছি। এখানেই তো আমাদের বঙ্গভবন। কিন্তু বাবা, অগ্রসেনের এই নির্মাণ কখনো দেখি নি। আধুনিক চলমান দিল্লির আবরণ সরালেই দেখা যাবে চতুর্দশ অথবা পঞ্চদশ  শতাব্দীর এই স্থাপত্য। আগরওয়াল সমাজের আদি রাজা ছিলেন রাজা অগ্রসেন। তুঘলক অথবা বা লোদি জমানাতেই এই নির্মাণ হয়। অগ্রসেনের রাজত্ব দিল্লি থেকে দূরে নয়। হরিয়ানার এখন যেখানে হিসার সেখানেই নাকি ছিল তাঁর রাজত্ব। আবার এই বাওলিতে ঢোকার মুখেই আছে এক ভাঙ্গা মসজিদ। বারবার মনে হচ্ছে অতীতে একটা সময় ছিল যখন হিন্দু আর মুসলিমরা পাশাপাশি থাকতো। সাধারণ হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে প্রতিদিনের সংঘাত ছিল না। তা না হলে জামা মসজিদের ঠিক পেছনে যেখানে পুলিশ চৌকি সেখানেই সুপ্রাচীন জৈন গলি থাকে কি করে? আর সেই মুঘল আমলের গলিতে আছে বগলা মায়ের মন্দির, হনুমান মন্দির।

বাবা, তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়নি তো? আজ এখানেই থামছি তবে আবার আসবো খুব দ্রুত।

ইতি

তোমার হরিদাস

(রচনা – জয়ন্ত ঘোষাল)