শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতির ভারত সফর সম্পর্ক মজবুত করবে

For Sharing

শ্রীলংকার নব নির্বচিত রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হবার পর প্রথম দেশ হিসেবে ভারত সফর কোনো নতুন কথা নয়। অতীতে এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে। তবুও কার্যভার গ্রহণ করার পর মাত্র দশ দিন পরেই প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে শ্রী গোটাবায়া রাজাপাকসে যখন নতুন দিল্লী এসে পৌঁছোন তার মধ্যে একটা কিছু জরুরী বিষয় বা অন্য কোনো তাগিদ ছিল।

শ্রীলংকা এবং তার ঘনিষ্ট প্রতিবেশী ভারতের মধ্যে সম্পর্কের নৈকট্য ছাড়াও দুটি দেশের মধ্যে যে আশা আকাংখ্যা রয়েছে তাতেও বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে সামঞ্জস্য বিধান করার প্রয়োজন রয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শংকর বিদেশী অতিথি হিসেবে সবার প্রথমে শ্রীলংকা সফর করেন এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদির শুভেচ্ছা বার্তা সহ তাঁর জন্য একখানি চিঠি নিয়ে যাওয়া ছাড়াও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানান। ভারত সফরের সময় অনুরূপ সৌজন্য প্রদর্শন করে শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি শ্রী মোদিকে শ্রীলংকা সফরের আমন্ত্রণ জানান। এই সফরের বিস্তারিত খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত করা হবে।

উভয় পক্ষের এই জরুরী তাগিদের কারণ হল কোনো ভাবেই যেন দুটি দেশের সম্পর্ক অতীতের দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে আবিষ্ট না থাকে তা শুনিশ্চিত করা। শ্রীলংকা যখন এল টি টি ইর সঙ্গে লড়াইএ লিপ্ত ছিল বিশেষ করে সেই সময় এই দ্বিধা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। মহিন্দা রাজাপাকসের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন যখন শ্রী গোটাবায়া রাজাপাকসে প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন তখন এই অবস্থার সূত্রপাত হয়। ভারত সেই লড়াইয়ে শ্রীলংকাকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে এবং একই সঙ্গে কলম্বোকে ক্রমাগত তামিল জনগণের সঙ্গে ন্যয্য আচরণ সুনিশ্চিত করারও আবেদন জানিয়ে এসেছে।

অবধারিতভাবেই নতুন দিল্লীতে আলোচনার সময় ঐক্যবদ্ধ শ্রীলংকায় তামিলদের ন্যয্য অধিকারের বিষয়টি উত্থাপিত হয়। বস্তুতপক্ষে, তামিল টাইগারদের সঙ্গে লড়াই এর অবসানের জন্য শ্রীলংকা সরকারের সফল অভিযানের এটি হল এক অসমাপ্ত কাজ। অতীতে আশ্বাস দেওয়া সত্বেও তামিলদের জন্য ন্যয্য ব্যবস্থা এখনও হয় নি। ভারত এই প্রশ্নে তাদের অবস্থানের কথা স্পষ্ট জানিয়েছে। শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতিও ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি রাজাপাকসে এক সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলেছেন যে যদিও তিনি জানেন যে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বচনে জয় লাভ করেছেন মূলতঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলীদের ভোটে, তবে তিনি সংখ্যালঘু তামিল এবং মুসলিম সহ সকলের প্রতি ন্যয্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। পর্যবেক্ষকরা একে ইতিবাচক লক্ষ্যণ বলে জানিয়েছেন।

সমানভাবে ভারতের উদ্বেগের কথা স্বীকার করে নিয়ে রাষ্ট্রপতি রাজাপাকশে তাঁর সফরের সময় আশ্বাস দেন যে চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রভাব কোনোভাবেই তিনি  ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পড়তে দেবেন না। তিনি স্বীকার করেন যে বিতর্কিত হ্যাম্বান্টোটা বন্দর প্রকল্প চীনকে দেওয়া হয়তো ভুল হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে রাষ্ট্রপতি রাজাপাকসে খোলা মন নিয়ে তাঁর কাজ শুরু করেছেন।

দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সময় ভারত প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও ভারতের এই ঋণের পরিমাণ চীনের কাছাকাছি নয়, তবে পরিকাঠামো প্রকল্পের বাস্তব রুপায়ণের ক্ষেত্রে ভারতের আর্থিক প্রতিশ্রুতির রেকর্ড খুবই ভালো। এছাড়াও, শ্রীলংকায় এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে যে এই দ্বীপ রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য বৃহৎ প্রকল্প এবং অধিক অর্থ বিনিয়োগ সর্বোত্তম নাও হতে পারে। হ্যাম্বান্টোটা বন্দর প্রকল্প এবং মাটালে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আসল উদ্বেগের নিরসন হলে ভারত-শ্রীলংকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে। শ্রী রাজাপাকসে বলেন “আমার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে আমি ভারত শ্রীলংকা সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিকভাবে আমাদের দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য বিদ্যমান”। এথেকে মনে হয়, কলম্বোর সঙ্গে নতুন দিল্লীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গী আনতে চলেছে। তিনি ইতিবাচকভাবে তাঁর যাত্রা শুরু করেছেন। (মূল রচনাঃ এম কে টিক্কু)