জীবে প্রেম করে যেই জন

For Sharing

নানানভাবে নাক মুখ ঢেকে যখন দলে দলে লোক দিল্লির রাস্তায় হেঁটে বেড়ায় তখন মনে হয় যেন কোন জৈন মুনিদের শহরে ঢুকে পড়েছি। হ্যাঁ, পলিউশনের যা অবস্থা, নাকে মুখে কখন কি ঢুকে যায় কে বলতে পারে? তাই মুখে ঢাকনা বেঁধে ঘুরে বেড়াতেই হয়। জৈন মুনিরা যখন মুখে কাপড় বেঁধে ঘুরে বেড়ান, ওঁদের কি শান্ত সৌম চেহারা। ওঁদের মুখে কোন পোকামাকড় ঢুকে যদি মৃত্যু হয় সেটা ভয়ংকর পাপ! কোন নিষ্পাপ প্রাণী হত্যা না ঘটে যায়। নিজেদের অজান্তেও কোন প্রাণী হত্যা না হয় তার জন্য সর্বদাই সচেষ্ট। কোন প্রাণীই নগণ্য নয়।

মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় আমরা খেলাধুলা করতে, মানে ক্রিকেট বা ফুটবল- যেতাম লালকেল্লার মাঠে । বিশেষ করে গরমের ছুটি–দুই মাস-মে জুন, ভোরবেলা ফুটবল বা ক্রিকেট ব্যাট আর উইকেট নিয়ে মাঠে পৌঁছে যেতাম সূর্য ওঠার আগেই।

হ্যাঁ, যা বলছিলাম আমরাই শুধু নয়, অন্তত পঞ্চাশটি আরও দল। এটা অবশ্য ঠিক, কোন দলেই এগারো জন নেই। আর এটাও ঠিক পুরো একটা মাঠ বা উইকেট কোন দলের জন্য নির্দিষ্ট থাকছে না। কার উইকেট, কে ব্যাটিং করছে বা কে কাকে বোলিং করছে বা কার গোলে কোন দলের গোলকিপার দাঁড়িয়ে রয়েছে বোঝা মুশকিল হয়ে যেত। কোন ব্যাটসম্যান বাউন্ডারি হাঁকড়ালে কোন দল চার রান পেলো তা বুঝতে বেশ সময় লাগতো। রান আউট নিয়ে গন্ডোগোল  লেগেই থাকতো। ফুটবল ম্যাচে গন্ডোগোল লাগতো ভুল গোলে গোল মারা নিয়ে। সে ঝগড়া মেতার আগেই ইতিমধ্যে কে আমার গোলে গোল দিয়ে গেল আবার সেই নিয়ে ঝগড়া।

ধুত্তেরি- কি কথা থেকে কোথায় চলে এলাম। ফিরে আসি নিজের কথায়। এর গোল না ওর গোল সেই গোলের গন্ডোগোলের মাঝখানে দেখা গেল গোলকিপার পা চুল্কে মরছে–সত্যি সত্যি পা ছুড়ছে। কি ব্যাপার। কোন পিঁপড়েপ্রেমী যে জুতো জোড়া দিয়ে আমরা গোলপোষ্ট করেছিলাম, পিঁপড়েদের কল্যাণের জন্য একটু আগে চিনি ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন । তার ফলে বহু সংখ্যক পিঁপড়ে এককাট্টা হয়েছে। ব্রেকফাস্টের জন্য তৈরি পিঁপড়েরা বিরক্ত হয়েছে গোলকিপারের অযাচিত চলাফেরার দরুণ। পিঁপড়ে বা গোলকিপার দু-পার্টিরই ‘গোল’ বা ‘লক্ষ্য’ আলাদা। তাই বিপর্যয়। এই পিঁপড়েপ্রেমীদের পোকামাড়দের প্রতি এত প্রেম অন্যত্র কম দেখা যায়।

খেলার মাঠের কথায় মনে পড়ে গেল। খেলার মাঠ সবসময় নিরাপদ নয়। লালকেল্লার মাঠ তো নয়ই। আমাদের খেলার মাঠে একজন আসতেন- পাঞ্জাবী, বৃদ্ধ তবে সর্দারজী নন। তিনি একটি কুকুরকে মাঠে বেড়াতে নিয়ে আসতেন। কে কাকে ঘোরাতো তা বলা যেত না। তবে ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোক এসে, নিজের একার ইচ্ছেতেই, বোলারের দিকের উইকেটটি তুলে কুকুরের গলার চেনে রিং তাইতে লাগিয়ে আবার পুঁতে দিতেন। কুকুরটা আমাদের খেলা শুরুর আগের ‘ফরম্যালিটি’- যেমন টিম তৈরি, টস প্যাড পরা, ইত্যাদি সেরা বোলার আগেই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়তো। এক একদিন বোলারদের ছোটাছুটিতে বিরক্ত হয়ে কিম্বা চোখের সামনে লাল বল দেখে ছুটে যেত। বোলার বেচারা হঠাৎ দেখতো পেছনের পায়ে কুকুরে দাঁত। কুকুরের মালিক তখন অন্যত্র শরীর চর্চা করছে। হয়তো একবার টমি টমি বলে ডাকতো। কিম্বা ক্যায়া হুয়া বেটা বলতো। আবার কখনো সেটুকুও নয়।

একবার এই কুকুরটাকেই দেখেছিলাম লালকেল্লার বাসস্টপে এক ক্লান্ত, বয়স্ক ষাঁড়কে শুঁকে শুঁকে এমন বিরক্ত করেছিল যে ষাঁড়টি উঠে, ছুটে গিয়ে বাসের লাইন ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল তিতিবিরক্ত হয়ে। আমার বিশ্বাস সে কুকুরটি আর নেই। হবে হয়ত। এও প্রায় ষাট বছর আগের কথা। আচ্ছা কুকুর কি এতদিন বাঁচে?

লালকেল্লার মাঠের কাছে, চাঁদনীচকের রাস্তায় একটা পাখিদের হাঁসপাতাল আছে। পরিন্দো কা হাঁসপাতাল। জৈনদের। শুনেছিলাম আমাদের দেশে এরকম হাসপাতাল একটাই আছে। এখন শুনছি আর একটিও আছে- তবে সেটা ঐ পূর্ব্বক্তটির মতো জৈন চ্যারিটেবল হাঁসপাতালের মত নয়। এই হাঁসপাতালটিতে পাখি বা অন্য জন্তু, অসুস্থ নিয়ে এলে তাকে শুশ্রুষা করে ছেড়ে দেয়-মালিককে ফেরৎ দেয় না। আমাদের চাঁদনীচকের বাড়ির ছাদে পড়ে থাকা দুটি অসুস্থ ‘চিল’  আমি ওখানে পৌঁছে দিয়েছিলাম। সত্যি বলতে কি, যে লোকটি পৌঁছে দিয়েছিল, আমি তার সঙ্গে গিয়েছিলাম। আমার আবার জ্যান্ত চিল নিয়ে যাবার সাহস কোথায়। আর আমাদের পেছন পেছন গিয়েছিল বেশ কয়েকজন পাড়ার ছেলেরা।

পাখি বা জন্তুদের ভাগ্য কুব ভালো। ওদের কত গল্প আমরা বলাবলি করি। আলোচনা করি। ওরা কি আমাদের নিয়ে কোনো আলোচনা করে? না, করে না।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তো গোটা একটা বই-ই লিখে ফেললেন। টুনটুনি-র বই। লীলা মজুমদার একটা মা-হাতি-র দুঃখের গল্প লিখেছিলেন। খুব সুন্দর। প্রেমেন্দ্র মিত্র, কুমীরকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। সেও ভালো।

আচ্ছা, শেয়ালরা চালাক হয়। বাঘ বা কুমীররা বোকা। এসব কথা তো এই লেখকরাই জানিয়েছেন। এসব কথা তো জন্তুরা বা পাখিরা কিছুই জানে না। কচ্ছপ যে খরগোসকে একটা রেস-এ হারিয়েছিল সে রেকর্ড কি ওদের জানা আছে?

যাকগে। জানে না-জানে না।

তবে হ্যাঁ,  আমার মনে হয় দু-একটা আমার নিজস্ব অবসারভেশন অন্যদের জানিয়ে রাখা ভালো। পরে সুবিধে হবে।

কলেজে পড়ার সময় একজন সমসাময়িক ছেলেকে দেখেছিলাম সে কলেজে কোটের পকেটে সাপ নিয়ে আসতো। আমি বলছি কারণ এই মনে হয় ও সাপকে পোষ মানিয়েছিল। মানে সাপ হয়তো পোষ মানে। আমি কি ঠিক।

আর একবার দেখেছিলাম একজনকে পকেটে কাঠবেড়ালী নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। সে অবশ্য প্যান্টের পকেটে রাখতো। একদিন ‘ কুটুস’ করে কামড়ে দেওয়াতে ওদের পারস্পরিক ভাব নষ্ট হয়ে যায়। কমপ্লিট ছাড়াছাড়ি।

কুকুর, বেড়াল, হাতি, বাঁদর এরা পোষ মানে জানি ভাল্লুকও পোষ মানে। তবে গন্ডার? আমি নিশ্চিত গন্ডার পোষ মানে না। তবে কেউ কি কোন চেষ্টা করেছে। অনেকটা হুঁকোকুখো হাংগলার মতো-যা সুকুমার রায় বলেছিলেন-কেউ কভু তার কাছে থেকেছো।

হ্যাঁ, খবরের কাগজে কুমীরের খবর পড়েছো কি? পড় নি? কোন এক দেশের প্রেসিডেন্ট কুমীর শুধু ভালোবাসতেন তা নয়-তাদের পুষতেনও। তিনি দেশের-না, নিজের শত্রুদের কুমীর দিয়ে খাওয়াবেন বলে তার পড়শি দেশের রাষ্ট্রপতি তাকে আদর করে একটি কুমীর দম্পতি উপহার দিয়েছিলেন। তা প্রথম রাষ্ট্রপতি তো ইতিমধ্যে মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর আদরের কুমীরেরা এখন রাষ্ট্রপতির পছন্দের মানুষ খেতে না পেয়ে এখন নিজেরাই নিজেদের খাবার খুঁজে নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির তৈরি জলাশয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কুমীর। স্বাভাবিক কারণে সে দেশের লোক সংখ্যা ক্রমশঃ কমে আসছে। কুমীরদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে সুন্দরী তিনি এই মানুষ খেঁকো কুমীরদের সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করেছেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি উপহার পাওয়া সেই কুমীর দম্পতিকে অন্যত্র পাচার করার পরিকল্পনা করেছেন। জীবে প্রেম এখন সেরকম নেই। তাই ঐ উপহার কেউ নিতে চাইছেন না।

তাই ভাবছিলাম-এমন একটা কি আমাদের যমুনার জলে ছাড়া যায় না। হ্যাঁ, যমুনার জল হয়তো পরিষ্কার নয়, কিন্তু তা বলে যমুনা কুমীরদেরও বাসযোগ্য নয়, না তা তো নাও হতে পারে। ভেবে দেখবেন।

এ শহরে চিড়িয়াখানায় অনেক সময় সিংহ-র খাঁচায় কোনো অপ্রকৃতিস্থ মানুষ সিঙ্ঘ-র সঙ্গে প্রেম বিনিময়ের উদ্দেশে ঢুকে পড়েন। তাঁরা এখন হয়তো কুমীরের জলে নামতে চাইবেন।

হ্যাঁ, মুসকিল একটাই। কুমীর তো পাখি নয়। চাঁদনীচকের পরিন্দো কা হাঁসপাতাল’ প্রয়োজনে অসুস্থ কুমীরদের চিকিৎসা কি করবে।

(রচনা – সুপ্তি রায়)