দেশবন্ধু

For Sharing

ভারতের এবং বিশেষ ভাবে বাঙালির কাছে দুটি মানুষের অভাব এক দীর্ঘকালীন শূন্যতার সঞ্চার করেছে। ওই দুই মহাজীবন এতই দ্রুত এবং অসময়ে অন্তরালে চলে গেলেন যে, ভারত নির্মাণ তথা বঙ্গজীবনের সঠিক পথনির্দেশের ক্ষেত্রটি অনেকটাই হয়ে উঠেছিল দিশাহীন। বস্তুত ঠিক এই দু‌ই ব্যক্তির চলে যাওয়া বাঙালি জীবনকে ভারতের জাতীয় স্তরের ভরকেন্দ্র থেকেও ক্রমেই বিচ্যুত করেছে। হয়ত ওই দুটি মানুষ যদি তাঁদের স্বাভাবিক জীবন আরও দীর্ঘকাল অতিবাহিত করার সুযোগ পেতেন, তা হলে আমরা বিশেষ করে বাঙালি জীবনের তো বটেই, গোটা  দেশেরই ভবিষ্যৎ পথ চলার ক্ষেত্রটি আরও একটু মসৃণ আর মহান হগে উঠতে পারত। এই দুই মহামনীষী হলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। ঘটনাচক্রে নেতাজির রাজনৈতিক গুরু ছিলেন দেশবন্ধু। সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনীতিতে পদার্পণ, আদর্শ নির্মাণ, দেশসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা, প্রতিটি জীবন মুহূর্তকেই প্রভাবিত করেছেন দেশবন্ধু। সুতরাং নেতাজির জীবনদর্শন দেশবন্ধুরই দান এরকম বলা হলে মোটেই অতিশয়োক্তি হবে না।  গুরু এবং শিষ্যের মধ্যে কী আশ্চর্য সাদৃশ্য। দুজনেই অসময়ে চলে গেলেন স্বাভাবিক জীবনের ছন্দকে পিছনে রেখে। দেশবন্ধু আচমকা দার্জিলিঙে মৃত্যুবরণ করলেন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে। অসময়ে। আর সুভাষচন্দ্র অন্তর্হিত হয়ে গেলেন ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। ঠিক যে সময়টিতে তাঁদের উভয়কে অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল, তার আগেই তাঁদের চলে যাওয়া তাই এক চিরকালীন ক্ষতি হয়ে থেকে গেল দেশ ও জাতির কাছে।

১৯২১ থেকে ১৯২২ সালে প্রথমে চার মাস প্রেসিডেন্সি জেলে এবং পরবর্তী ৬ মাস আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে সুভাষচন্দ্র যাঁর সঙ্গে একই কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছিলেন, তিনি হলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। শুধু সহকারি বন্দি নয়। সুভাষচন্দ্রের উপর ভার পড়েছিল চিত্তরঞ্জন দাশের কিছু ব্যক্তিগত কাজে সহায়তা করাও। যেমন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে দেশবন্ধুর কারাবাসের শেষ কিছু মাস তাঁর রান্নার কাজেও সুভাষচন্দ্র নিয়োজিত করেছিলেন নিজেকে।  দেশবন্ধুর সংস্পর্শে এসে সুভাষচন্দ্রের শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে যায়। শুধু রাজনীতি নয়, সুভাষচন্দ্রকে মননগত ভাবেও দেশবন্ধু প্রভাবিত করেছেন। বিশেষ করে সুভাষচন্দ্র দেশবন্ধুর যে বৈশিষ্ট্যটি নিয়ে শ্রদ্ধাশীল, তা হল,  মালিন্যহীন এক হৃদয়। দেশবন্ধুর সব থেকে বড় গুণ ছিল তিনি মানুষের ভালমন্দ বিচার করে তাঁর উপকার করতেন না কিংবা তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতেন না। তিনি ধরেই নিতেন প্রতিটি মানুষ মনের দিক থেকে ভালো। পরিস্থিতি হয়ত তাকে খারাপ অথবা উন্নত করেছে।

দেশবন্ধুর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল ইংরাজি ও বাংলা সাহিত্যে। তার মধ্যেও আবার ব্রাউনিং এর কবিতা ছিল বিশেষ প্রিয়। কারাবাস কালে সুভাষচন্দ্রকে মাঝেমধ্যেই নিরালায় ব্রাউনিং এর কবিতা পড়ে শোনাতেন উদাত্ত কণ্ঠে।  আর ওই পাণ্ডিত্য এতটা‌ই ছিল যে, স্বাভাবিক কথাবার্তা কিংবা রসিকতা সুলভ আলোচনার মধ্যেও উচ্চারণ করতেন আচমকা কোনও সাহিত্যের পংক্তি। কারাগারে থাকাকালীনও দেশবন্ধু সর্বদাই থাকতেন স্বদেশচিন্তায় মগ্ন। নিবিষ্ট মনে লিখে যেতেন স্বদেশজাগরণের গ্রন্থ। সরল ভাষায় স্বদেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ  করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

দেশবন্ধুর মধ্যে একই সঙ্গে বসবাস করত সারল্য এবং বৃদ্ধিবৃত্তি। যা এক আশ্চর্য মেলবন্ধন।  তিনি ছিলেন এক বৃহৎ মনের দাতা। কত মানুষ যে তাঁর থেকে সাহায্য পেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। হয়ত মিথ্যা বলেও অর্থ আত্মসাৎ করেছে। দেশবন্ধু বলেছিলেন, তোমরা ভাবো আমি বোকা। আমাকে ঠকিয়ে টাকা নিয়ে যায়, আমি কিছু বুঝতে পারি না। কিন্তু আসলে আমি সব বুঝতে পারি। কিছু বলি না। আহা, হয়ত লোকটার সত্যিই প্রয়োজন।

একই ব্যক্তির মধ্যে রয়েছে ভারত ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের ভাণ্ডার। আবার সেই মানুষটির মধ্যেই লক্ষ্য করেন এক প্রণম্য বোধ। দেশবন্ধুর একটি মনোভাব চিরকাল অধিুনিক। সেটি হল স্ত্রী শিক্ষা ও স্ত্রী স্বাধীনতায় বিশ্বাস এবং নারীজাতির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা। ঠিক সেই শিক্ষাটি গ্রহণ করেই সুভাষচন্দ্র বসু যখন নেতাজি হয়েছিলেন, তখন আজাদ হিন্দ বাহিনীতে নারীদের জন্য তিনি গঠন করেছিলেন বিশেষ বাহিনী।

সুভাষচন্দ্রকে বহরমপুর জেলে পাঠানোর পূর্বে একবার কারাগারে দেখা করতে আসেন দেশবন্ধু। সুভাষচন্দ্র তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, অনেকদিন হয়ত আর দেখা হবে না আমাদের। হেসে উঠে দেশবন্ধু বলেছিলেন, তা কেন? আমি শীঘ্রই তোমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করছি। অথচ তার পর জেলে বসেই সুভাষচন্দ্র হৃদয়বিদারক এক সংবাদ পেলেন যে, দেশবন্ধু আর  নেই। ১৯২৫ সালে তিনি চলে গেলেন অমৃতলোকে।

দর্শন, স্বদেশচেতনা, জীবনবোধ আজও বাঙালির এক চির অনুসরণযোগ্য বাণী। দেশবন্ধুর প্রদর্শিত জীবনপথেই নিজেদের নিয়োজিত করাই বাঙালির কাছে এক অমোঘ আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে আজও। আজ আমরা দেশবন্ধুকে প্রকৃত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে চাই, তা হলে স্বপ্ন ও চিন্তার অনুসারী হয়ে নিজেদের উপযুক্ত করে তুলতে হবে। দেশবন্ধু বলতেন ভারতে স্বরাজের প্রতিষ্ঠা করতে হবে উচ্চ শ্রেণির স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়। জনসাধারণের উপকার  ও মঙ্গলের জন্য।  আজীবন বাঙালি জাতি হিসাবে দেশবন্ধু গৌরব বোধ করতেন। তিনি বলতেন দোষগুণ লইয়াই বাঙালি। বাঙালির এত বড় মহৎ বন্ধু রাজনীতির জগতে ছিল বিরল।

আর মাত্র কিছুদিন পর আসছে নতুন বছর। ২০২০ সাল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সার্ধ শতবর্ষ। সেই পবিত্র দেড়শো তম জন্মবর্ষ পালনে বাঙালি ও গোটা দেশ মনে মনে প্রস্তুত। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে দেশবন্ধুর সব থেকে বড় বন্দনা হবে তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরে চলার অঙ্গীকার।

(রচনা – মানসী দত্ত বসু)