সংবিধানের ৭০

For Sharing

                                                            

১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের সংবিধান রচনার কাজটি কী প্রবল সামাজিক আর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে   দিয়ে হয়েছিল তা বিশ্বের ইতিহাসে সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ। দেশের বিভিন্ন  প্রান্ত থেকে অসংখ্য মতামত, মতবাদ, দাবি, পালটা মতবাদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সংবিধান রচনাকারীদের সামনে। এই বিপুল এক দেশের অজস্র ভাষাভাষী, ধর্ম, উপধর্ম, সংস্কৃতি সমুদ্রের ভারতবাসীর চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে প্রবল টানাপোড়েন সামলাতে হয়েছে তাঁদের। সেই সংবিধান গ্রহণের ৭০ বছর পূর্ণ হল এই বছর। ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান সভায় অনুমোদিত তথা পাশ হয়েছিল ভারতের সংবিধান। স্থির হয়েছিল ঠিক ২ মাস পর অর্থাৎ ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে সেই নয়া সংবিধান অনুযায়ী ভারত হবে নয়া প্রজাতন্ত্র। সুতরাং এই ২০১৯ সাল ভারতের সংবিধান অনুমোদন তথা গ্রহণের ৭০ তম বর্ষ। আর সংবিধান প্রণয়ণের ৭০ তম বর্ষ আগামী বছর। অর্থাৎ ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবস মাত্র এক মাস পর ৭০ তম জন্মদিনে পা রাখবে।

সংবিধান গ্রহণের দিন অর্থাৎ ২৬ নভেম্বরের পূর্বদিন সংবিধান সভায় দাঁড়িয়ে বাবাসাহেব আম্বেদকর বলেছিলেন, আমাদের সংবিধানে ৩৯৫টি ধারা রয়েছে, আর সেখানে আমেরিকার সংবিধানে রয়েছে মাত্র ৭টি ধারা। তার মধ্যে প্রথম চারটি ধারা বিভাজিত হয়ে পৃথক ২১ টি বিভাগে পরিণত করা হয়েছে। কানাডার সংবিধানে রয়েছে ১৪৭টি ধারা। অস্ট্রেলিয়ার রয়েছে ১২৮টি।  দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে ১৫৩। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান প্রণেতাদের কোনও প্রকার সংশোধনীর সম্মুখীন হতে হয়নি। সেগুলি যেমন ভাবে পেশ করা হয়েছিল, সে ভাবেই পাশ হয়ে গিয়েছিল। পক্ষান্তরে, ভারতের সংবিধান-সভা শুধু ২৪৪৩টি সংশোধনী নিয়েই আলোচনা করেছে। সংবিধান রচনা কমিটির চেয়ারম্যান বাবা সাহেব আম্বেদকর বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, বিদেশি রাষ্ট্রগুলির সংবিধান নির্মাণের সঙ্গে ভারতের মতো বিপুল এক রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা কতটা কঠিন ছিল।

সংবিধানের ৭০ তম বর্ষ আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে কিছু প্রশ্ন। সংবিধানকে অমান্য করে আজ সমাজে ধর্ম নিয়ে হানাহানি বেড়েছে, জাতপাত নিয়ে রাজনীতি বিদ্যমান। আজ সবথেকে বেশি আমরা  আলোচনা করি, ঝগড়া করি, চর্চা করি আর পরস্পরকে আক্রমণ করি প্রধানত দুটি বিষয়ে। ধর্মীয় বিভেদ এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত। অথচ সংবিধান রচনাকারীরা সবার আগে যেটা ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন সেটি হল এই দুই বিভেদ। অস্পৃশ্যতা, জাতপাত, সম্প্রদায়গত এবং ধনী দরিদ্র বিভাজনের পাশাপাশি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শত্রুতার অবসান চেয়েছিলেন তাঁরা। আজ আমাদের ওই মহান রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের প্রদর্শিত পথেই অগ্রসর হওয়া দরকার। সেই পথ অনুসরণ করার জন্য অমাদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন ভারতের সংবিধান পাঠ, অনুধাবন এবং আত্মস্থ করা। নিছক পলিটিক্যাল সায়েন্সের সিলেবাসে আবদ্ধ না রেখে আজ এই অশান্ত সময়ে প্রতিটি ভারতবাসীর উচিত একজন নাগরিক হিসাবে সংবিধানকে দিশা পরিচালক হিসাবেই বিবেচনা করা।  আমাদের মনে রাখতে হবে আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য চলছে এক নিরন্তর লড়াই। বহু দেশের মানুষ নানাবিধ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ক্লান্ত। তারা উপলব্ধি করেছে যে আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের জন্য মানুষ হংকং থেকে আফ্রিকা, সর্বত্র লড়াই করছে। সুতরাং আমাদের বহু পরিশ্রম, রক্তে, আত্মবলিদানে প্রাপ্ত এই ভারতবর্ষের গণতন্ত্র রক্ষা করা আমাদের ভারতবাসীর একান্ত কর্তব্য। ভেদাভেদ ভুলে প্রতিটি নাগরিক যদি শুধুমাত্র নিজেদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করি একান্ত নিষ্ঠা আর একাগ্রতায়, তা হলেই কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হয়। একা কোনও সরকার অথবা রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে ১৩০ কোটি দেশবাসীর প্রতিটি কার্য সম্পাদন করা  কি সম্ভব? কখনওই সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি উন্নতির জন্য সরকারই দায়িত্বশীল অথবা প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য সরকারই দায়ী,এই মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের প্রত্যেকের উচিত হবে শুধু যে অগ্রগতিতে যুক্ত হওয়া তাই নয়, দায়িত্ব গ্রহণ করা। আজ যদি গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র সাধারণ মানুষ নিজেদের কাজটি আমরা সঠিক ভাবে পালন করি, তা হলে দেখা যাবে দেশের অনেক সমস্যাই দূর হচ্ছে। ভারতীয় গণতন্ত্রের ধর্মগ্রন্থ হল সংবিধান। সংবিধানের ৭০ তম বর্ষে আমাদের এই শপথই গ্রহণ করতে হবে যে আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও গণতন্ত্রকে রক্ষা করব। তাহলেই একটি দেশ প্রকৃত অর্থে হয়ে উঠবে গণতান্ত্রিক।

(রচনা-শ্বেতম দত্ত)