জাগো বাঙালী !

For Sharing

সংবাদ পত্রের মাধ্যমে জানিতে পারিলাম তুমি দেশের চিন্তায় দিবা রাত্রি মগ্ন হইয়া রহিয়াছো! হইবে নাই বা কেন! বঙ্গ সন্তান বলিয়া কথা। বঙ্গ কূলে তোমার জন্ম। তাই জন্ম সূত্রে তুমি নিজেকে চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, বুদ্ধিজীবী বলিয়া দাবী করিলে, আমি গর্বিত হইবো না কেন! আরাবল্লির কোলে জন্ম হইলেও রক্তে ও সংস্কারে আমি বাঙালি , উহা লুকাইবো কেমনে! যদিও তোমরা আমাদের আড়ালে আবডালে ‘মেড়ো বাঙালি’ বলিয়া উপহাস করিয়া থাকো।
জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি (এনপিআর), জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) ইত্যাদি লইয়া দেশ যখন অস্থির হইয়া উঠিয়াছে, তুমি বঙ্গ সন্তান হইয়া স্থির থাকিবে কেমনে? তাই দুচার গাছি রেল লাইন উপড়াইয়া, কাঁসর ঘণ্টা বাজাইয়া নিজ উপস্থিতি জাহির করিলেও কিষ্কিন্ধা জয় করিতে পারিয়াছ কি?

আমার কথা তোমাদিগর নিকটে প্রলাপ বলিয়া মনে হইলেও আমার বিবেকবুদ্ধি এখনও লোপ পায় নাই। বহির্বঙ্গের বাঙ্গালীর জীবন সংগ্রাম কফি হাউসের আড্ডায় খুঁজিয়া পাইবে না। সময় পালটাইয়াছে, যুগ পরিবর্তন হইয়াছে। বিবেকের পরিবর্তে প্রলোভন আজ প্রতিবাদের ইষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

আচ্ছা মৈত্রী, তোমরা কথায় কথায় আমেরিকা, ইংল্যান্ডের দোহাই দিয়া থাকো। উহাদের সামাজিক সু-ব্যবস্থাপনার গুণগান করিতে পারিলে তোমরা ধন্য হইয়া যাও। কখন ভাবিয়া দেখিয়াছো কি, ঐ সুব্যবস্থাপনা সুকঠিন আইনের কারণেই সুরক্ষিত। সেই কঠোর আইনের বেড়াজাল টপকাইবার কোন পথ নাই। সেথায় বেআইনী অনুপ্রবেশকারীদের কারাবাস করিতে হয়। আমরা মানবদরদী, তাই ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’এর কথা বলিয়া থাকি।

জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি লইয়া এত ভাবিবার কি রহিয়াছে, আমি বুঝিতে পারিতেছি না। বিশ্বের প্রতিটি দেশে, সে দেশের নাগরিকের নিজস্ব তালিকা রহিয়াছে। তুমি ভারতীয়। তুমি ভারতের নাগরিক। তাই তোমার র‍্যাশন কার্ড রহিয়াছে, আধার কার্ড রহিয়াছে, প্যান কার্ড, পাসপোর্ট, ভোটার কার্ড রহিয়াছে। চিন্তা কি। সরকার চিৎকার করিতেছে, ‘চিন্তা নাই, চিন্তা নাই। তুমি ভারতীয়। তোমার চিন্তা নাই’। কিন্তু বিবেক যেথায় অন্ধ, কর্ণ সেথায় বধির। তুমি বাঙালী হইয়া অন্ধ-বধির কেন হইবে!

জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি’র নামে প্রচার চলিতেছে, ইহাতে তোমার মাতা পিতার জন্ম স্থান সরকার নথিভুক্ত করিবে। ইহাতে তোমার নাগরিকত্ব কোথায় বিপর্যস্ত হইতেছে, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছিনা। আজ যাঁহারা দিল্লীর বুকে অধুনা চিত্তরঞ্জন পার্কে বসবাস করিতেছে তাহারা তাঁহদিগের মাতা পিতার জন্ম স্থান লিখিয়াই সরকার হইতে বাসযোগ্য এই জমি পাইয়াছে। ভুলিলে চলিবে না, চিত্তরঞ্জন পার্ক, যাহাকে পূর্বে বলা হইত ইপিডিপি কলোনি অর্থাৎ ইস্ট বেঙ্গল ডিস্প্লেস পার্সনস কলোনি। ভারত সরকার দেশভাগ ও ১৯৭১এ বাঙালী ও অবাঙালী শরণার্থীদের বসবাস হেতু যে জমি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিয়াছিল তাহা তাহাঁদিগের মাতা পিতার নাম ও তাহাঁদের জন্ম স্থান লিখিয়াই্ প্রাপ্ত করিতে হইয়াছিল। তাছাড়া ‘দণ্ডকারণ্য প্রোজেক্ট’ এও এই একই ইতিহাস আমি দেখিয়াছি, আমি পড়িয়াছি। ইহাতে অন্যায় কি তুমি কিছু দেখিতে পাইয়াছ? তুমি বাঙ্গালী হইয়া বিস্মিত হইলেও, বহির্বঙ্গের বাঙ্গালী হইয়া আমি বিস্মিত হই কেমনে ?

একদা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে কহিয়াছিলেন – ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’। পথ প্রদর্শক পথ ভ্রষ্ট হলে সমাজের পতন এবং ভাঙ্গন অবধারিত। আমরা পতিত হইয়াছি কি? তবে কি মনে করিব বাঙালী তাহাঁর রাজ সিংহাসনচ্যুত হইয়াছে। মন কিন্তু একথা মানিতে চাহে না।

আমি দিল্লীতে জন্মিয়াছি। গ্রীষ্মের ‘লূ’ আর শিতের ‘কড়ক ঠনড’এ পিটঠু খেলিয়া বড় হইয়াছি। এই আরাবল্লির আবহাওয়ায় রবীন্দ্রনাথের হইতে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের ভক্তের সংখ্যা অধিক গুনিতে গুনিতে আর অবাঙ্গালির হাতের স্যালুট খাইয়া বড় হইয়াছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের মত নমস্য ব্যক্তিত্বরাই বাঙালী হওয়ার গর্ববোধ সেই অবুঝ কাল হইতে আমাদিগকে বুঝাইয়া দিয়াছেন।

শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ কিম্বা সুভাষচন্দ্র বোস নহে বিবেকানন্দ, নজরুল, জীবানানন্দ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সত্যজিৎ রায় আমাদের সকলের গর্ব। তাই বছরের এই শেষ সময়ে দাঁড়াইয়া অনুরোধ করিতেছি, বিবেকবান হও। দেশকে সঠিক ভাবে আমাদিগকেই লইয়া যাইতে হইবে। আমরা বাঙালী, তাই আমাদের পথ হউক শান্তির পথ, বিকাশের পথ, অগ্রগতির পথ। তাই পথভ্রষ্ট বাঙালি হিসেবে নয়, পথপ্রদর্শক বাঙালি হিসেবে নতুন বছরকে আমরা স্বাগত জানাই-

নিত্য যেথা তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা-
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,
ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।।

এই কামনা করিয়াই আজ শেষ করিলাম। ভালো থাকিও।

(লিখেছেন- শুভা রায়)