পাকিস্তানে পরিবর্তন ও তার প্রেক্ষিত

For Sharing

প্রখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক সলিম সফি সম্প্রতি ‘ডেইলি জঙ্গ’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক হাল হকিকত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সেখানে অবিলম্বে একটা নতুন সামাজিক সংযোগ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সোফির মতে, পাকিস্তান বর্তমানে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। একে অপরের প্রতি তাদের এমন মনোভাব গড়ে উঠেছে যে একটি প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়লে অন্যটি খুশী হয়। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রয়োজন একটি মধ্যস্থতাকারী কমিশনের যা অতীত সময়ে হওয়া সমস্ত ভুলভ্রান্তিগুলি খতিয়ে দেখবে এবং রাজনীতির একটি নতুন ধারা তৈরি করতে পারবে।

পাকিস্তান বর্তমানে নানা দিক থেকে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন তার প্রেক্ষিতে এই ধরণের খেদোক্তি পাকিস্তানে ক্রমশ বাড়ছে সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক স্তরে, অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থাকাকালীন দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের অভিযোগ খণ্ডনে ব্যস্ত।

সরকারি কার্যালয়ের বিভিন্ন দুর্নীতির তদন্তের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় দায়বদ্ধতা কমিশন – NAB, জনসমক্ষে বিরোধীদের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার কাজে  অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কারো মনে হতে পারে এর ফলে সরকার নিজেদের মর্জি মতো কাজ করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি। ইমরান খানের সরকার অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রতিহিংসার  রাজনীতি শুরু  করেছে যার ভিত্তি হল ফলাফলশূণ্য বাগাড়ম্বর এবং এর ফলে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রহসনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও ইমরান সরকার যে এটা করতে পারছে তা থেকেই তাঁর সরকারের গূঢ় গভীর শক্তির উৎসটি কি তা বোঝা যায়।

যখন দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান বর্তমান সরকারকে সর্বস্তরে ব্যর্থতা সত্বেও সমর্থন যোগাচ্ছে, তখন দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মত বিনিময়ের অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নয়, বিরোধিতা করছে  সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একে অপরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, গত নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের সেনা প্রধানের নিযুক্তি নিয়ে বিচার বিভাগের তোলা প্রশ্ন এবং  বিশেষ আদালতে পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক প্রধান পরভেজ মুশারফের বিরুদ্ধে মৃত্যু দন্ডাদেশ। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই ধরণের দন্ডাদেশ এড়ানো যেতে পারত। কিন্তু বর্তমানে এই চ্যালেঞ্জ রাখা হয়েছে এবং ইমরান সরকার এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের গূঢ় চালিকাশক্তির ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

এটাও লক্ষনীয় যে, পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলি এই ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি হওয়ার জন্য এখনও পর্যন্ত প্রস্তুত নয়। গত ২রা জানুয়ারি ২০২০তে দেশের প্রধান বিরোধী দল PML-N, বর্তমান সেনা প্রধানকে পুণর্নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা প্রদান সংক্রান্ত সরকার প্রস্তাবিত বিলটিকে কোনোরকম প্রতিবাদ ছাড়াই সমর্থন জানিয়েছে। একইভাবে, সামরিক বাহিনীকে খুশি করতে মুশারফের বিরুদ্ধে রায়টিতে স্থগিতাদেশ অথবা শাস্তি কম করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।

এই ধরণের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের চূড়ান্ত ফল হল, দেশের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ক্রমশঃ হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে অনেক আলোচনাতেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ হচ্ছে যা আগে দেখা যায় নি। সেনাবাহিনী বর্তমানের দূর্বল আইনসভার থেকে নানারকম সুবিধা আদায় করে নিতে পারলেও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নিঃসন্দেহে ধাক্কা খেয়েছে।

পাকিস্তানের বিরোধীরা যে এই পরিস্থিতির সদব্যবহার করার চেষ্টা করছে না তার  প্রধান কারণ হল, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরো বিঘ্নিত করতে পারে এমন ভ্রান্ত পদক্ষেপের আশঙ্কা। এখন বিরোধী দলগুলির মূল লক্ষ্য হল, ইমরান সরকারের  বৈধতা খারিজ করা, সরকারের পিছনে থাকা বাহিনীকে দূর্বল করা নয়। তবে  এর মধ্যেও সেনাবাহিনীর আগের মতোই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ও সুযোগ রয়েছে। এখনও পর্যন্ত পাকিস্তানের সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যে সেনাবাহিনী ইমরান সরকারের সঙ্গেই বেশী ঘনিষ্ঠ। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে যত পরিবর্তন আসবে, যত তারা একই অবস্থানে থাকবে, সোফির নতুন সামাজিক সংযোগের আশা ততই অধরা থেকে যাবে।

(মূল রচনাঃ ডঃ অশোক বেহুরিয়া)