নতুন অস্তিত্ব

For Sharing

প্রিয় ঋজু,

নিত্যদিনের যাপনে আমরা অনেক অনুভূতিই আত্মস্থ করি। কিন্তু সেটিকে যখন ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষণ আসে, তখন শব্দের পর শব্দ বসিয়ে উপলব্ধির আয়না নির্মাণ যে কত কঠিন, সেকথা অনুভব করে আমরা ভারী লজ্জা পাই। আর তখনই আবার যেন বোধোদয় হয় যে, রবীন্দ্রনাথ আজও কেন বাংলা ভাষার ঈশ্বর। ‘যাত্রী’ নামাঙ্কিত পত্র সংকলনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, অভ্যেস আমাদের চৈতন্যকে ম্লান করে। অর্থাৎ আমাদের পরিচিতি পরিসরে প্রতিনিয়ত চক্ষুগোচর হওয়া দৃশ্যবালীর মধ্যেই যে কত অনির্বাণ চিত্রকল্প স্পষ্ট হয়ে থাকে, তার মাধুর্য আমরা ওই আবহের মধ্যে নিত্যযাপনের কারণে সর্বদা হয়তো টের পাই না। অথবা উপেক্ষা করি। আমার জানালায় প্রতিদিনই যদি চন্দনা আর বসন্তবউরির আনাগোণা হয়, আর তাদের  কলকাকলিতে রোজই আমার পারিপার্শ্বিক মেতে থাকে সুরেলা কোলাহলে, তাহলে একটা সময় আমাদের সেই স্বরবিচিত্রাকে আর মূল্যবান বলে মনে হবে না। হয়তো আর পাঁচটা নানাবিধ জীবনের শব্দের মতোই তাদের ঝগড়া, গান কিংবা উচাটন মনের সশব্দ প্রকাশ আমাদের কানে পৃথক কোনও অভিঘাত নিয়ে আসবে না। যেমন আমরা যখন কোনও পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে ধ্যানগম্ভীর ঋষিসম পর্বতশিখরের নিমগ্নতায় অপার্থিব বোধে আচ্ছন্ন হই, অথচ সেই পাহাড়ি গ্রামের মানুষগুলির প্রতিদিনের কাঠ সংগ্রহের সংগ্রামে সেই পর্বতের মাহাত্ম্য ফিকে হয়ে যায়। কারণ তাঁরা তো সেখানেই বাস করে বারো মাস। ওই পাহাড়ের নানা রূপ তাই তাঁদের চেতনায় পৃথক কোনও প্রভাব বিস্তার করে না। হয়তো এই প্রবণতাকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, অভ্যেস আমাদের চৈতন্যকে ম্লান করে। কী আশ্চর্য সত্যি কথা। নতুন বছরে আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতাই হল আগামীকে ঘিরে থাকা আশা আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নের জাল বিস্তার করা। আজ নতুন বছরের উজ্জ্বল সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হল পিছনে একবার মুখ ফেরাই। তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলাম অতীত হয়ে যায়নি ফেলে আসা বছরের মুহূর্তগুলি। ওই যে স্পষ্টই যেন দেখা যাচ্ছে আমার অপ্রাপ্তিগুলির কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি গোপন আকাঙ্ক্ষা। তারা আশা দিতে এসেছিল যে আমি যেন সেই স্বপ্নগুলো এবছরও জিইয়ে রাখি। গত বছরের বসন্ত পঞ্চমীর সকালে যে অপমানটি আমাকে কাঁদিয়েছিল, তাকে দেখলাম বছরের শেষদিন এসে দাঁড়িয়েছে লোদি গার্ডেনের গেটে।  তার হাত ধরে আছে মাঘি পূর্ণিমায় গত বছর হরিদ্বারে যাওয়ার পথে মীরাট রোডের সোনালী বাতাস। মনে পড়ে গেল সেই বাতাস এসে আমার অপমানে প্রলেপ দিয়ে বলেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। আজ তাই ওরা একসঙ্গেই আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিল। আজ এই নতুন বছরের অলিন্দ থেকে দেখছি ওরা ফিরে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। বর্ষবরণে একটি নাগরিক প্রবণতা রয়েছে তুমি তো জানো। সেটি হল রেজোলিউশন বা শপথ  গ্রহণ। আমার কেন যেন মনে হল এবার অঘোষিত  রেজোলিউশন হবে চোখ থেকে মনের শাসনকে সরিয়ে আনা। আমরা বড্ড কেজো হয়ে গিয়েছি ঋজু। তাই আমাদের প্রতিটি ইন্দ্রিয় হয়ে পড়ছে যন্ত্রবৎ। এ বছর অশোক রোডে  চলার পথে আমার চোখ যদি স্বাধীনভাবে জামগাছগুলির ডালে শাখায় পাতায় খোঁজে মোহনচুড়া পাখির অনর্গল ডাকের উৎস, আমি আর কোনও অফিস মিটিং এর তাড়নায় সেই চোখকে ফিরিয়ে আনব না দ্রুত রাস্তা পেরনোর তাগিদে। কিছুক্ষণ বরং আমি আর আমার মন অনুসরণ করব  চোখকে। সত্যিই তো কতদিন দেখিনি মোহনচুড়া পাখির সেই উঁচু ঝুঁটির বাহার। এই শীতকালেই তো তারা আসে দিল্লির জলাশয় আর গাছগুলির পাতার আড়ালে। গত বছরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অনেকটা দূরে আমার এক চেনা  ইচ্ছে হাত দিয়ে ইশারা করে আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে আমি জুলাই মাসে নিজেকে বলেছিলাম, এবার দুদিনের জন্য ডালটনগঞ্জ যাবো। কতকাল কোয়েল নদীর সূর্যাস্ত দেখা হয়নি। গত বছর সে দুদিন আর আসেনি। দেখতে পাচ্ছি ওই যে সেই ইচ্ছেটা চলে যাচ্ছে আমার আয়ুরেখার দুটি দিনের পিঠে হাত রেখে অনন্তের দিকে মিলিয়ে। গত বছর শরৎকে কথা দিয়েছিলাম যমুনার চরে ফুটে ওঠা কাশফুল নিয়ে আসব ঘরে। সেই কাশফুলের কাছে নিশ্চয়ই গিয়ে খবর দিয়েছিল বর্ষাহীন শরতের বাতাস।  জানো ঋজু, বছরের প্রথম দিনটিতে আমি পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম সেই শরৎ, ছদ্মবেশে এসে ফুলহীন শিউলি গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে আমার দিকে অভিমানের হাসি হেসে বলছে, তুমি তো  কথা রাখলে না।  আমাদের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, সাফল্য আর ব্যর্থতা দিয়ে ঘিরে রাখা একটি গোটা বছরের প্রতিটি করতলে কিন্তু আমাদের একটি করে স্মৃতি রাখা রয়েছে। ফেলে আসা বছর সেই করতলটি মেলে ধরে থাকে। তার প্রত্যাশা থাকে আমরা নতুন বছরের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে তার করতল থেকে সেই ফেলে আসা মুহূর্তগুলিকেও অঞ্জলি পেতে নেব। গত বছরের জানুয়ারিতে হয়তো রয়ে গিয়েছে কিছু প্রতিশ্রুতি। এপ্রিলের কাছে পড়ে আছে  বেশ কয়েকটি বেদনার অশ্রু। সেপ্টেম্বরে ভালবাসাকে দিয়েছিলাম আন্তরিক আমন্ত্রণ। হেমন্ত ফিরিয়ে দিয়েছিল কোনও এক ফেলে আসা সুখস্মৃতিকে। এই পিছন ফিরে পুরানো বছরের হাত থেকে মূহূর্তগুলিকে গ্রহণ করে নতুন বছরের সিঁড়িতে ওঠা কেন দরকার জানো ঋজু? কারণ ওই ফেলে আসা বছরটি আমাকে নতুন দুঃখ, নতুন সুখ, নতুন বেদনা, নতুন ভালবাসা আর নতুন মানুষ উপহার দিয়েছে। শুধু বছর নয়, আমিও তো বদলে গিয়েছি! নতুন বছরে পদার্পণ করেছে আসলে একটুখানি নতুন আমি। তাই না? নতুন বছরের শুভেচ্ছা নিও। ভালো থেকো।

ইতি কৃষ্ণচুড়া।

(রচনা – সমৃদ্ধ দত্ত)