বাগদাদে ইরান-মার্কিন ছায়া যুদ্ধ

For Sharing

বাগদাদে কঠোর নিরাপত্তা পরিবেষ্টিত মার্কিন দূতাবাস পরিসরকে ঘিরে ইরান-মার্কিন উত্তেজনা এখন চরমে। এই মার্কিন দূতাবাস পরিসরে ইরান পন্থী মিলিশিয়াদের অতর্কিত আক্রমণে একজন মার্কিন ঠিকাদার নিহত ও কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হবার পর ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসলামিক সাধারণ তন্ত্র ইরানের মধ্যে দীর্ঘ সময় ব্যাপী অব্যাহত ছায়া যুদ্ধ এখন  প্রকৃতই এক আক্রমণাত্মক রূপ নিয়েছে।

বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে হামলার পর রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে গত মাসের ২৯ তারিখে  বাগদাদে ইরান আধা সামরিক বাহিনীর অন্তত পাঁচটি কেন্দ্রে মার্কিন হামলায় ২৫ জন নিহত ও বহু আহত হয়। এই ঘটনার বদলা হিসেবে  ইরাকে সক্রিয়  ইরান-অনুগামী শক্তি বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের আবার ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করে।

এর আগে ইরান-সিরিয়া সীমান্তে মার্কিন কেন্দ্রের ওপর হামলা চালায় ইরান সমর্থিত খাতেব হেজবুল্লা নামে শিয়া পন্থী আধা সামরিক বাহিনী। এই বাহিনী ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের কারণে সে দেশে গৃহ যুদ্ধের সময় সক্রিয় হয় এবং সিরিয়ার গৃহ যুদ্ধে অংশ নেয়, সে দেশের কোণ ঠাসা রাষ্ট্রপতি বাশার-আল-আসাদ’এর সমর্থনে।

গত মাসের ২৯ তারিখে  বাগদাদে ইরান আধা সামরিক বাহিনীর অন্তত পাঁচটি কেন্দ্রে মার্কিন হামলার পর রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক টুইট বার্তায় তেহেরানের  বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন ইরানী কর্তৃপক্ষকে। টুইট বার্তায় তিনি  ইরাকে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্যেও ইরাকী কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হুঁসিয়ারি যে নিছক ভয় দেখানো ছিল না অচিরেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। এর কয়েকদিনের মধ্যেই বাগদাদে  মার্কিন বিমান আক্রমণে ইরানের কুদ বাহিনীর কম্যান্ডার মেজর জেনারেল কাশেম সোলেমানি সহ ইরাকী মিলিশিয়া নেতা আবু মাহাদি আল মুহানদিজ নিহত হল।  এই ঘটনাকে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মার্ক টি এসপার তাঁর দেশের একটি  নির্ণায়ক সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করলেন।

উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে পূর্বতন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার আমলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অন্য পাঁচটি সম্পাদিত দেশের সম্পাদিত পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর মে মাসে বেরিয়ে এসে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তি ব্যবস্থা জারি করে। এর ফলে সে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা ও তার সঙ্গে  সরকার বিরোধী আন্দোলন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তা সত্বেও এতদিন দুটি দেশ সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে পেরেছে। তবে  মার্কিন কতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তার সহযোগী দেশগুলির গুরুত্বপূর্ণ সব কেন্দ্রে ইরান হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে বলে খবরের প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন, তেহেরানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে বাগদাদে  মার্কিন বিমান আক্রমণে ইরানের কুদ বাহিনীর কম্যান্ডার মেজর জেনারেল কাশেম সোলেমানি সহ ইরাকী মিলিশিয়া নেতা আবু মাহাদি আল মুহানদিজ’এর নিহত হবার ঘটনা ঘটলো।

অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প,তাঁর বিরুদ্ধে মহাবিচারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দেশের মানুষের সামনে তাঁর ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যেই ইরানের এই দুই ক্ষমতাশালী সামরিক নেতাকে লক্ষ্য কোরে বোমা হামলা চালালো; যেমন পূর্বতন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন, মণিকা লিউনেস্কী কেলেংকারিতে তাঁর বিরুদ্ধে আনা মহাবিচারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আফগানিস্তানে আল-কায়দা জঙ্গি ঘাঁটির ওপর আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ সব সত্বেও পরিস্থিতি যাতে নাগালের বাইরে চলে না যায়, তার জন্য দু পক্ষকেই সাবধান থাকতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও চাইবেন না যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বছরে ইরানে ১৯৮০ সালের  মার্কিন  পণ বন্দি সংকটের মত পরিস্থিতি আবার সৃষ্টি হোক; যে ঘটনা দুটি দেশের মধ্যে চার দশক ব্যাপী বৈরিতার বীজ বপন করে। ইরানে বর্তমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে দেশের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির কাছেও এই ধরণের পরিস্থিতি নিশ্চয়ই অভিপ্রেত হবে না বলেই মনে হয়।

ইরান সহ সমগ্র উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে ভারতের স্বার্থ জড়িত। এই অঞ্চলের তেল ভারতের তেজঃশক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিপুল সংখ্যক ভারতীয় শ্রমিক এই অঞ্চলে কর্মরত, তাঁদের পাঠানো অর্থ ভারতের মূল্যবান বিদেশী মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস। এখন ইরানের ওপর জারি মার্কিন শাস্তি ব্যবস্থার অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভারত-ইরান জ্বালানী বাণিজ্যের ওপর। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারত তার নিজের স্বার্থেই  ইরান-মার্কিন উত্তেজনার আশু প্রশমনের লক্ষ্যে যে কূটনৈতিক স্তরে সম্ভাব্য সব ধরণের প্রচেষ্টা চালাবে, তাতে কোনও সন্দেহই নেই। (মূল রচনাঃ- পি আর কুমারস্বামী)