বাঙালী আইকন 

For Sharing

বাঙালি সবথেকে বেশি পছন্দ করে গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে।  অ্যাডভেঞ্চার আজীবন এক রহস্যময় আকর্ষণ হয়ে ডাক দিয়েছে বাঙালি মননকে। সেই অ্যাডভেঞ্চারের নায়করা কিংবা গোয়েন্দাদের লার্জার দ্যান লাইফ ভাবমূর্তি, কার্যকলাপে নির্জন দুপুরে আমরা শিহরিত হয়ে চলেছি বছরের পর বছর। বাঙালি উত্তমকুমারের ভক্ত। কারণ ধুতি পাঞ্জাবীতে তিনি ঠিক পাশের বাড়ির চেনা সুদর্শন যুবকটি। অথচ পর্দায় তাঁর উপস্থিতির মধ্যে এক মোহিনী রহস্য থাকে। বাঙালির মতো সৌভাগ্যশালী জাতি আর নেই। কারণ একটি আদর্শ পরিবার, একটি কিশোর, একজন  যুবক বাঙালির মন ঠিক যতদূর পর্যন্ত কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে, তার প্রতিটি বিন্দু সফলভাবে স্পর্শ করেছেন দুই প্রাতঃস্মরণীয় বঙ্গসন্তান। স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। বাঙালি চরিত্র সম্পর্কে ঠিক যে অভিযোগগুলি বিদ্যমান সেই ভীরু, ঘরকুনো অথবা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার অক্ষমতা ইত্যাদি তকমাকে ধূলিসাৎ করে এই দুই মনীষী শুধু বাঙালির নয়, গোটা ভারতবর্ষের কাছে বিস্ময়কর রোলমডেল হয়ে উঠেছেন। এবং আজ বাঙালিকে যদি কখনও কেউ ভীরু ও দুর্বল আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে জাতি হিসাবে, তা হলে তাদের মুখের উপর জবাব দেওয়ার জন্য এই দুটি নামই যথেষ্ট।  সুতরাং এই দু‌ই মহান আত্মা শুধু যে আমাদের দিশানির্দেশ করেছেন তাই নয়। বিশ্বের কাছে বাঙালি হিসাবে গর্বিত করার একটি উদাহরণ স্থাপন করে গিয়েছেন তাঁরা। এই জানুয়ারি মাস এই দুই মহৎ প্রাণেরই জন্মদিবস। তাই সব উৎসব আর পার্বনকে পিছনে ফেলে বছরের প্রথম মাসটি যেন ক্রমেই হয়েই উঠেছে আত্মদর্শনের এক সময়। তাঁরা দুজন চিরকালীন নায়ক। একজন নায়ক সাধারণ মানুষের কল্পনায় ঠিক যা যা করে থাকেন এই দুইটি চরিত্র তাঁদের কর্মক্ষমতায় সেই কল্পনাকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন।

আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে সুভাষচন্দ্র হেলায় সরকারি চাকরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁকে যতটা ধুতি পাঞ্জাবীতে নিপাট সৌম্য এক বাঙালি সুদর্শন যুবক, ঠিক ততটাই আন্তর্জাতিক মানের দুরন্ত স্মার্টনেস আইএনএ ইউনিফর্মে। একজন  যুবক প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। সামান্য আপস করেন না। কোনও দুঃসাহসিক কাহিনীর রচয়িতা বেস্ট সেলার বইয়ের লেখক যে প্লট লিখতে পারেননি কোনওদিন, ঠিক সেই চরম রহস্যময় আর অসমসাহসী অভিযানে এককভাবে বেরিয়ে গিয়েছেন। ভবানীপুরের একটি গলিতে একটি উচ্চবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের আর্থসামাজিক নিরাপত্তায় বসে থাকা এক যুবক মনে মনে প্ল্যান করতে পারেন ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে মধ্যরাতে একটি গাড়িতে চেপে গোমো স্টেশন হয়ে আফগানিস্তান  থেকে জার্মানী চলে যাওয়া যায়। যে সময় গোটা পৃথিবীকে শাসন করার স্বপ্ন দেখছেন যে একনায়ক, সেই হিটলারের সঙ্গে কলকাতার একটি যুবক দেখা করে ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করার স্বপ্ন দেখতে পারেন। হিটলারের থেকে সেরকম আশ্বাস না পেয়ে সেই যুবক কোনওভাবেই দমে না গিয়ে জাপানে যাবেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের কাছে আত্মসমর্পণ করা ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে একটি পূর্ণ সেনাবাহিনী নির্মাণ করার মতো রূপকথা রচনা করবেন। সাবমেরিনে চেপে সমুদ্রপার। এবং সত্যিই ব্রিটিশকে আতঙ্কিত করে আক্রমণ করা। এই বিস্ময়কর আন্তর্জাতিক ইতিহাসের অন্যতম সাহসী অভিযানগুলির নায়ক নেতাজি।

ঠিক এভাবেই কলকাতার সিমলা পাড়ার এক কলেজে পড়া যুবক নরেন্দ্রনাথ দত্তের তো আর পাঁচজন সমবয়সী যুবকের সঙ্গেই উনবিংশ শতকের বাবু কালচারে সময় অতিবাহিত করে দেওয়াই  ছিল সঙ্গত। কিন্তু অবিশ্বাস্য এক স্বপ্ন লালন করছিলেন তিনি। স্বপ্ন তো অনেকেই দেখে। কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত করার সাহস কজনের হয়? কলকাতার অদূরে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে সেই সিমলা পাড়ার যুবক এমন একটি আগুনের সন্ধান পেলেন যে সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তাঁর অন্তরেও সঞ্চারিত হল। এবং শুধু বাংলা, শুধু ভারত নয়, সেই আগুনের শিখা তিনি বিশ্ববাসীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার শপথ নিলেন। যে যুগে খুব কম বাঙালিই কলকাতার বাইরে পা রেখেছেন, সেরকম এক সময়ে ঘর আর দেশের সীমা ছাড়িয়ে একাকী উঠে বসেছিলেন এক যুদ্ধ অভিযানের জাহাজে। যে জাহাজ সিঙ্গাপুর, জাপান হয়ে পৌঁছবে সুদূর এক অচেনা দেশ আমেরিকার উপকূলে। আর সম্পূর্ণ অজানা এক মাটিতে প্রাণপণ অস্তিত্বের সংগ্রামের পর জয় করে আনলেন বিশ্বনাগরিকের মর্যাদা। হয়ে উঠলেন আর এক মহামানব।

এই রূপকথাগুলি আজও স্মরণ করলে মনে হয়, এই দুই মানবসন্তান  বাঙালি ছিলেন না। ভারতীয় ছিলেন না। হয়ত কোনও মানবচরিত্র ছিলেন না। তাঁরা আসলে যেন ছিলেন একক অস্তিত্ব! এক ক্ষণজন্মা রোলমডেল। যাঁকে আমরা আজকের বাঙালি আইকন হিসাবে পুজো করি। কী অদ্ভূত সাদৃশ্য।  ১৯৪৩ সালের দোসরা অক্টোবর ব্যাংকক থেকে একটি রেডিও ভাষণে নেতাজি দুটি শব্দের উপর জোর দিয়েছিলেন। যাতে আমরা ওই দুটি শব্দকে আজীবন আত্মস্থ করি। সে দুটি হল সেল্ফ রেসপেক্ট আর সেল্ফ কনফিডেন্স। আত্মসম্মান। আর আত্মবিশ্বাস। আর তারও অনেক আগে স্বামী বিবেকানন্দের বার্তা ছিল উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত। অর্থাৎ ওঠো জাগো! ইংরাজি ক্যালেন্ডার নির্মাণ করেছিলেন  গ্রেগরিয়ান সাহেব। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেই বিদেশি কালসরণির ইতিহাসে বছরের সূত্রপাতেই আমরা ভারতবাসী হিসাবে দুজন মহাত্মাকে স্মরণ করার সুযোগ পাই। তাঁদের আদর্শ পাথেয় করে আমাদের আর একটি নতুন বছরের পথ চলা শুরু হয়। এই দৈব ঘটনা যেন বিধাতার এক আশীর্বাদ!

(রচনাঃ সমৃদ্ধ দত্ত)