আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিজ্ঞানের ভূমিকা

For Sharing

বিজ্ঞান চর্চা এমন একটি বিষয়, যা প্রথাগতভাবে গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলেই ধারণা। । তবে  ভারতকে ধারাবাহিক উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে  বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নতিকে ক্রমাগত বেশি মাত্রায় কাজে লাগানোর সরকারীভাবে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মহাকুম্ভ  হিসেবে অভিহিত সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে  সম্পন্ন ১০৭-তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষাকে ক্রমাগত অধিক মাত্রায় জন কল্যাণমুখি করে তুলতে বৃহত্তর সমাজ, কর্মস্থল  ও স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রের সঙ্গে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সমন্বয় সাধনের গুরিত্বের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

এ বছরের ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের মূল বিষয়ভাবনা ছিল “বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গ্রাম উন্নয়ন”। সম্মেলনে বক্তাগণ প্রযুক্তিকে সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সেতু বন্ধনের ভূমিকা পালনের উপযোগী কোরে তোলার প্রয়োজনের ওপর জোর দেন।  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিকে  মানবিক আশা আকাংক্ষা পূরণের মাধ্যম হিসেবে প্রয়োগ করলে সমগ্র উন্নয়নী প্রক্রিয়ায় তার অত্যন্ত ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হল জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়ন। এই সমস্যার সামনে মানব সভ্যতার অস্তিত্বই এখন বিপদাপন্ন।  আর এর জন্য আমরাই প্রধানত দায়ী। সম্প্রতি আমাজন অরণ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানলের ঘটনার যে প্রধান কারণ মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ, তা আমরা অস্বীকার করতে পারি কী? বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই  বর্তমানে  প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের  ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে; যে কারণে সমগ্র জীব জগতের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠছে। সামুদ্রিক ঝঞ্ঝা, বন্যা, খরা, ভূমিকম্প ও দাবানলের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্রমবর্ধমান ঘটনা তারই প্রমাণ বহন করছে। সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে উপরাষ্ট্রপতি এম ভেংকাইয়া নাইডু তাঁর ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যাকে কোনো একটি দেশের বা একটি অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা না কোরে সমগ্র বিজ্ঞানী কূলকে এই সব সমস্যার মোকাবিলায় একযোগে কাজ করার আহ্বান জানালেন। তিনি বলেন, কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই নয়,জীবন যাত্রার গুণগত মানের উন্নতিসাধনকেই আমাদের  চূড়ান্ত লক্ষ্য করতে হবে; আর এ জন্য প্রয়োজন  জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যার সংঘবদ্ধ মোকাবিলা। উপরাষ্ট্রপতি বলেন, ভারতের মত বিশাল দেশে জনগণের জীবন যাত্রার মানের গুণগত উন্নতিসাধনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের দিকটির প্রতি আমাদের যথাযথ নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে জনসাধারণের কাছে বিভিন্ন সামাজিক যোজনার সুফল এখন অধিক সাফল্যের সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কৃষি প্রণালী ও স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রেও এখন উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটছে। তিনি বলেন, এই কাজকে আরও সুষ্ঠু ও ফলদায়ী করার উপায় অন্বেষণ এখন বিজ্ঞানী মহল, পরিকল্পনাবিদ ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সামনে  বড় চ্যালেঞ্জ।

ভেংকাইয়া নাইডু বলেন, বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে কেবলমাত্র প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা বা এই খাতে ধার্য অর্থবরাদ্দের পরিমাণের নিরিখে বিচার করলে চলবে না, সমগ্র মানব সমাজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে বিজ্ঞানকে আমরা কতখানি কাজে লাগাতে পারছি, তার নিরিখেই এই সাফল্যের মূল্যায়ন করতে হবে।

১০৭-তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে  নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী, জার্মানির স্টেফান ডব্ল্যু হেল, তাঁর ভাষণে বলেন,  বিজ্ঞান ক্ষেত্রে যে সব যুগান্তকারী আবিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে, তার অধিকাংশই পূর্ব পরিকল্পিত নয়।; বা সেগুলির মধ্যে অধিকাংশই জন সাধারণের তাৎক্ষণিক আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপযোগী নাও হতে পারে। তিনি  বলেন, তবে এগুলি দীর্ঘ মেয়াদে মানব কল্যাণে অতি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর অজস্র উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।

ভারতে রয়েছে বিশাল মানব সম্পদ, বিশাল যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে বিজ্ঞান মনস্কতা, আর আছেন– স্যার জগদীশ বোস, স্যার সি ভি রমন, মেঘনাধ সাহা, শ্রীনিবাস রামানুজন,হোমি জে ভাবার মত বিশ্ব বন্দিত বিজ্ঞানী কূল। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় বিজ্ঞান জগতের এই মহান ঐতিহ্যকেই সামনে রেখে আমাদের সকলকে জন জীবনের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মৌলিক সমস্যার সমাধানের উপায় খুঁজতে হবে। (মূল রচনাঃ-এন ভদ্রন নায়ার)