দিল্লীর পৌষ মেলা

For Sharing

লিখেছেন – সীমন্তিনী ভট্টাচার্য্য

টেলিফোন, মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুকের যুগেও এই চিঠি লিখতে বসে একটা প্রশান্তি অনুভব করছি। মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা, যখন মা আমাকে ভাঙাচোড়া শব্দেই আত্মীয় স্বজনদের চিঠি লেখাবার অভ্যেস করাতেন। যদিও ছেলেবেলায় তা খুব বিরক্তিকর মনে হতো, কিন্তু আজ বুঝতে পারছি মায়ের এই শিক্ষাই আমার আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা বাড়িয়েছে।    

আমার দিল্লীর বাস প্রায় এক দশক হতে চলল। না, পেশাগত কারণে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগ প্রায় হয়ে ওঠেনা। তাই বাংলায় এই চিঠি লিখতে বসে মনে এক অনবদ্য অনুভূতির সঞ্চার অনুভব করছি। প্রবাসে শুধু মানুষ, ভাষা এবং খাবারই নয়, আবহাওয়ার সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হয়তো সবারই একটু সময় লাগে, আমারও লাগছে। প্রতি বছর এক নতুন চমক এবং নতুন বৈচিত্র  দেখি এই আরাবল্লির কোলে। গত ডিসেম্বর মাস ছিল শতকের শীতলতম মাস। ঠান্ডায় জমে যাবার উপক্রম। এই শীতে ইচ্ছে করে ঘরে বসে গরম চা-এর পেয়ালায় চুমুক লাগাই, কিন্তু জীবনযুদ্ধে সেই বিশ্রাম কোথায়? অগত্যা বাইরে বেরোতেই হয়।  

নতুন সব্জির সম্ভারের সাথে গায়ে শীতের পোষাক উঠতেই বাঙালীর  পাতে থাকে নলেন গুড়। এই যুগেও সাবেকিয়ানা বজায় রেখে পৌষের ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালীর ঘরে এখনো নামমাত্র হলেও পিঠের গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু এ প্রবাসে সেই গুড়ের তৈরী পিঠে-পায়েস কই? এই সময় মনটা চলে যায় ফেলে আসা সেই দিনগুলোর কাছে। মনে পড়ে মায়ের হাতে বানানো রকমারি পিঠে পুলির কথা। মনে পড়ে পৌষ সংক্রান্তির দিন সকালবেলা স্নান সেরে পাড়া পড়শির বাড়ি ঘুরে ঘুরে পিঠে খাবার কথা।  

পৌষের ডাক যখন কানে বাজতে শুরু করেছে তখন একবার পৌষ মেলায় চক্কর মারতেই হয়।  অবাক হলেন? এ কবিগুরুর শান্তিনিকেতন নয়, এ দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্ক। 

বিগত ৪৬ বছর ধরে দিল্লীর মেলা গ্রাউন্ড প্রাঙ্গণে সি আর পার্ক বঙ্গীয় সমাজ জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় শনিবার এবং রবিবার এই পৌষ মেলার আয়োজন করে আসছে। 

প্রসঙ্গত জানাই, চিত্তরঞ্জন পার্ককে এক সময় ই পি ডি পি কলোনি   বলা হতো। দিল্লীর এই চিত্তরঞ্জন পার্ক সেই সময় ভারতে আসা বাঙ্গালি উদ্বাস্তুদের একটা রি-সেটেলমেন্ট কলোনি হিসেবে পরিচিত হলেও আজ রাজধানীর এক সভ্রান্ত কলোনি হিসেবে খ্যাত। বাস্তু-ভিটে হারালেও সংস্কার হারায়নি বাঙ্গালিরা। তাদের প্রচেষ্টায় শুরু হয় এই পৌষ মেলা।    

গত ১০ই জানুয়ারি থেকে ১২ই জানুয়ারি এই মেলা বসেছিল চিত্তরঞ্জন পার্কের স্বামী বিবেকানন্দ মেলা প্রাঙ্গণে;  যা মেলা গ্রাউন্ড নামে পরিচিত। এলাকার খুদেদের নাচ গানের সঙ্গে সঙ্গে প্রখ্যাত কলাকুশলীদের অনুষ্ঠান এই মেলার প্রতি বছরের এক বিশেষ আকর্ষণ। বাঙ্গালীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল,  তাঁরা সর্বত্রই নিজের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধরে রাখে। এই মেলা তারই এক উদাহরণ। আগে চাঁদা তুলে এই মেলার আয়োজন করা হত কিন্তু এখন ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে স্পনসারশিপ ও মিডিয়া কভারেজের সাথে। শুনলাম, শুরুর দিকে নাকি তাম্বোলা খেলা ছিল এক অন্যতম প্রথা কিন্তু  ধীরে ধীরে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।

সবার আগে বলা যাক এখানকার ‘পিঠে উৎসব’ এর কথা। এই মেলার সেরা আকর্ষণ। আমিষ ও নিরামিষ  খাবারের সঙ্গে সঙ্গে পুলি পিঠে, ভাপা পিঠে, পাটিসাপটা, নলেন গুড়ের পায়েস আরোও নাম না জানা মুখরোচক কত কি! মনে পড়ে গেল  দিদার নলেন গুড়ের পায়েস আর আমার প্রিয় দুধ পুলির কথা। ঘরোয়া পরিবেশের সঙ্গে ঘরোয়া খাবার। ঘরোয়া খাবার কারণ এখানকার মহিলারা নিজের হাতে খাবার ও পিঠে বানিয়ে এই মেলা প্রাঙ্গনে স্টল লাগান।

খাবার দাবার ছাড়াও ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ছিল শিশুদের জন্য দোলনা। মেলা প্রাঙ্গনে ঘুরতে ঘুরতে হটাৎ নজর গেল একজন মৃৎশিল্পীর দিকে। মাটি দিয়ে একমনে তৈরি করে চলেছেন ছোট ছোট মাটির পাত্র। অসাধারণ দক্ষতায় সুনিপুণভাবে চলছে তাঁর হাত আর তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আকারের মাটির পাত্র। দেখে মনে হল, এক টুকড়ো গ্রাম বাংলা উঠে এসেছে এই রাজধানী দিল্লীতে। এছাড়াও এই মেলায় ছিল জামা-কাপড় ও শাড়ির স্টল, গয়নার স্টল এবং আর্ট গ্যালারি। আর ছিল কোলকাতার প্রখ্যাত পোষাক বিপণির এক্সক্লুসিভ শাড়ির সম্ভার। এছাড়াও এক নামজাদা গয়না প্রস্তুতকারি সংস্থার বিভিন্ন কালেকশন ২০২০’র পৌষ মেলায় নজর কেড়েছিল। মেলায় ঘুরতে ঘুরতে দেখা হয়ে গেল পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে। তাই বন্ধুদের সঙ্গে  আড্ডা ছিল এই মেলার উপরি পাওনা।  

মনে পড়ে গেল কবিগুরুর লেখা-

শীতের দিনে নামলো বাদল

বসল তবু মেলা।

বিকেলবেলায় ভিড় জমেছে,

ভাঙল সকাল বেলা। 

পথে দেখি দু’তিন টুকড়ো 

কাঁচের চুড়ি রাঙা,

তারি সঙ্গে চিত্র করা 

মাটির পাত্র ভাঙ্গা।

আসল কথা তো বলাই হল না। বাউলের কথা! পৌষ মেলা হবে আর   বাউল গান হবে না তাই কি হয়? নাই বা হল শান্তিনিকেতন!  

” ও নূরের রৌশনীতে দুনিয়া গেছে ভরে

সে নূরের বাতি জ্বেলে মদিনার ঘরে ঘরে” 

তিন দিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানের শেষ সন্ধ্যায় কোলকাতার এক প্রখ্যাত বাউল ব্যান্ড মাতিয়ে রেখেছিল উপস্থিত দর্শক মণ্ডলীকে। কনকনে ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে  ৮ থেকে ৮০ সবাই সেই আনন্দযজ্ঞে সামিল হয়েছিল। চারিদিকে যেন এক আনন্দ উচ্ছাসের প্লাবন। সেই বাউলের সুরে ভেসে যেতে যেতে খুঁজে পেলাম এক অদৃশ্য মিল, লাল মাটির দেশের সঙ্গে আরাবল্লির দেশের।   

এই তিন দিনের পৌষ মেলা একসময় যা ছোট মেলা হিসেবে শুরু হয়েছিল তা আজ ভারতের রাজধানী দিল্লীর বুকে বাঙালিদের এক অন্যতম উৎসব হয়ে উঠেছে। আমি যেন প্রবাসের মাঝে খুঁজে পেলাম আমার একান্ত আপন গ্রাম বাংলাকে। এ এক অন্যরকম উন্মাদনা। 

এই ভাবেই রসে বসে বেঁচে থাকুক বাঙালি। দীর্ঘজীবী হোক বাঙ্গালীর সংস্কৃতি, দীর্ঘজীবী হোক বাঙ্গালী। আজ এখানেই শেষ করছি।   
 (লিখেছেন – সীমন্তিনী ভট্টাচার্য্য)