‘রানার’

For Sharing

“করুণা করে হলেও চিঠি দিও

খামে ভরে তুলে দিও আঙ্গুলের মিহিন সেলাই 

ভুল বানানেও লিখো প্রিয়,

বেশি হলে কেটে ফেলো তাও 

এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও” 

‘চিঠি’ – ‘চিঠি’ মানেই মানব মনের অনুভূতির অভিব্যক্তি। অনুভূতি সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার, অনুভূতি বিরহ-মিলনের, অনুভূতি স্বীকৃতি-প্রত্যাখ্যান আর মান-অভিমানের। শুধু তাই নয় সাহিত্যে, সঙ্গীতেও চিঠির এক অনন্য ভূমিকা রয়েছে।    

মানব হৃদয়ের ভাবপ্রকাশের এহেন বাহক আজকের দিনে প্রায় একেবারেই উপেক্ষিত, অবহেলিত।  ডিজিটাল যুগে চিঠি লেখার চল একেবারে নেই বললেই চলে। হাতের কাছে এখন বহু বিকল্প মজুত!  ই-মেল, ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটস আপ, ভিডিও চ্যাটিং আরও কত কি! সব কিছুই আজ ‘অনলি এ ক্লিক অ্যাওয়ে’। ব্যস, মুহূর্তে পৌঁছে গেল কাঙ্ক্ষিত মানুষের কাছে মনের কথাটি।   

আজ কিন্তু এখানে শুধু ব্যক্তিগত চিঠির কথাই বলছি যেখানে সম্পর্কটা একান্তই আত্মিক।   

ডিজিটাল যুগে চিঠি লেখার অভ্যাস চলে গেছে। কর্মব্যস্ততা, সময়ের অভাব অথবা ভাষার অভিব্যক্তির অভাব কারণ যাই হোক না কেন।  তবে লেখার অভ্যাস চলে গেলেও মনের ভাবনা এবং ভাব আদান প্রদানের আকুলতা কিন্তু যায়নি। আর এই আকুলতাকেই ব্যক্ত করার জন্য আপনার হয়ে চিঠি লিখে দিতে আগ্রহী এমন অনেক ব্যবসায়ী সংস্থার আবির্ভাব ঘটেছে। বিশ্বাস করুন বা না করুন, বর্তমানে অন্যের হয়ে চিঠি লিখে তা ইপ্সিত পাত্রপাত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেবার জন্য অনেক স্টার্ট-আপ কোম্পানী সামনে এসেছে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত চিঠি লেখারও  আজকাল আউটসোর্সিং হচ্ছে। অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে। কারণ, এটাই কোম্পানীর আয়ের উৎস। আর এই সম্পূর্ণ  দায়িত্বটি সম্পাদনের অধিকাংশ আবেদনই দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চল দিল্লি থেকেই। মূলতঃ সে জন্যই দিল্লির চিঠিতে এই প্রসঙ্গের অবতারণা।   

চিঠির মধ্যে বেশির ভাগই আবার একান্ত প্রিয়জনকে পাঠানো। শুনলে কারই বা বিশ্বাস হয় বলুন! আপন জনের কাছে  নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করব, তাকে আমার বক্তব্য জানাবো তাও আবার তৃতীয় পক্ষ মারফত! কিন্তু আজকাল এমনটাই হচ্ছে। এই স্টার্ট-আপ কোম্পানীগুলির এখন একমাত্র পরিচয় “আপনার ব্যক্তিগত পত্র লেখক”। এমনি এক কোম্পানীর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম – বয়স মাত্র কয়েক  মাস, এর মধ্যেই তিন হাজারের মত, গড়পড়তা দিনে ৬৫ টির মত চিঠি লিখে দেওয়ার অনুরোধ রক্ষা করেছেন, যার মধ্যে অধিকাংশই একান্ত কাছের মানুষের কাছে পাঠানো ব্যক্তিগত চিঠি। প্রশ্ন হোল, চিঠি   না হয় আপনার হয়ে আমি লিখে দেব। আমি তা টাইপ করেও তো দিতে পারি। না, তা চলবে না; হাতে লিখে পাঠাতে হবে। কারণ, হাতে লেখা চিঠিতে যে আন্তরিকতা, যে প্রাণের ছোঁয়া অনুভব করা যায়, টাইপ করা চিঠিতে কি তা হয়? হয় না, কারণ, এটা তো নিছক একটা যান্ত্রিক ব্যাপার হয়ে গেল। তা ছাড়া অনেকেই চান হাতে লেখা চিঠি স্মৃতি হিসেবে নিজের কাছে রেখে দিতে। সে কারণেই ই-মেল, ফেসবুক, হোয়াটস-আপ, টুইটার’এর রমরমা সত্বেও হাতে লেখা চিঠির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। 

দু একটি স্টার্ট আপ সংস্থাকে প্রশ্ন করে আরও কয়েকটি তথ্য সামনে এল।

প্রথমতঃ আমরা প্রত্যেকেই চাই প্রিয়জনকে হাতে লেখা চিঠি পাঠাতে ও তাদের কাছ থেকে হাতে লেখা চিঠি পেতে। কিন্তু বর্তমান দিনে খাম পোস্টকার্ড জোগাড় করে নিজের হাতে চিঠি লিখতে বসা বা চিঠি ডাকে ফেলার সময় বের করা প্রায়ই সম্ভব হয়ে ওঠে না।

দ্বিতীয়তঃ  প্রিয়জনের কাছে আপনি যে চিঠি পাঠাবেন, তার বিষয় বস্তু  আপনি পত্রলেখককে জানিয়ে দিলেন। ব্যস, আপনার কাজ শেষ। এখন সেই বিষয়বস্তুকে সাহিত্য রসে সিক্ত করে ব্যক্তিগত অনুভূতির স্পর্শ দিয়ে সুন্দর হস্তাক্ষরে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখে প্রাপকের কাছে পাঠিয়ে দেবার যাবতীয় দায়িত্ব এবার সংশ্লিষ্ট স্টার্ট আপ সংস্থাটির। এই চিঠির আবেদনই আলাদা। তবে এ ক্ষেত্রে কিন্তু চিঠিতে যা লেখা হোল তাতে প্রেরকের প্রাকঅনুমোদন অবশ্যই প্রয়োজন।

তৃতীয় তথ্যটি হল, অনেকে আবার চিঠির সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু টাইপ করে দিলেন। আপনার কাজ হোল কেবল তা সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে প্রাপকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। 

ব্যক্তিগত চিঠি লিখে দেওয়া একদিকে যেমন একটা চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আবার অতীব তৃপ্তিদায়ক – বললেন দিল্লির একটি স্টার্ট কোম্পানীর কর্ণধার। চিঠির মাধ্যমে মানসিক ব্যবধান দূর ক’রে দুটি  সত্তাকে পরস্পরের কাছে আনা নিঃসন্দেহে একটা চ্যালেঞ্জ; আর এই কাজে সফল হলে তাতে স্বাভাবিকভাবেই চরম প্রাপ্তি অনুভব করা যায়। ঐ কোম্পানীর কর্ণধার একটি উদাহরণ দিলেন। তিনি জানালেন – “হাসপাতালের বেডে শুয়ে অশীতিপর এক ঠাকুমা নিজের জীবনের ছোট ছোট ঘটনা উল্লেখ ক’রে বিদেশে থাকা তাঁর  আদরের নাতনিকে  জীবনের কিছু বুনিয়াদি মূল্যবোধের আদর্শে অনুপ্রাণিত করার অন্তিম ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। হাসপাতালের বেডে এই মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধার পাশে বসে  তিনি যা যা বলতে পেরেছেন সেগুলি লিপিবদ্ধ করে যথা স্থানে পাঠিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। বৃদ্ধার চোখে মুখে  দেখেছিলাম এক স্বর্গীয় তৃপ্তি।”   

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য’র ‘রানার’কে আমরা এই ডিজিটাল যুগে আবার খুঁজে পেয়েছি, আর সেই রানার খুঁজে পেয়েছে তার নতুন পথ। ঐ সূর্য উঠছে, অন্ধকার মুছে গিয়ে আলো  ফুটে উঠেছে। রানার তোমার জন্য  আমার অন্তরের দরজা খুলে দিলাম। স্বাগত তোমাকে রানার।      

(লিখেছেন কৃষ্ণধন রায়)