ভারতের প্রতিবেশী প্রথম নীতিঃ আঞ্চলিক উপলব্ধি

For Sharing

ভারতের শীর্ষ গবেষণা সংস্থা নতুন দিল্লীর প্রতিরক্ষা সমীক্ষা এবং বিশ্লেষন প্রতিষ্ঠান আই ডি এস এর ব্যবস্থাপনায়  ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি এবং আঞ্চলিক উপলব্ধির বিষয়ে দ্বাদশ দক্ষিণ এশিয় সম্মেলন সম্প্রতি সুসম্পন্ন হয়ে গেল। তাতে দক্ষিণ এশিয় অঞ্চল এবং মিয়ানমারের নীতি নির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং বিশেষজ্ঞগণ এই সব দেশের কাছে ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির অর্থ কী তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দু’ দিনের এই সম্মেলনে প্রায় ২৫টি নথি পেশ করা হয়। বিদেশী অংশগ্রহণকারীরা ছাড়াও ৯জন ভারতীয় অংশগ্রহণকারী ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির বিষয়ে তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করেন। উদ্বোধনী ভাষণে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং জোর দিয়ে বলেন যে এখন সময় এসেছে প্রতিটি অঞ্চলকে ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়ের উর্ধে উঠে সমগ্র দক্ষিণ এশিয় হিসেবে ভাববার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আই ডি এস এরও সভাপতি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্রী ভি মুরলিধরণ ভারতের প্রতিবেশী নীতির বিভিন্ন দিকের প্রতি আলোকপাত করেন।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন তাঁর পদে শপথ গ্রহণ করেন, তখন গুরুত্ব ছিল প্রতিবেশীদেশগুলির ওপর। তিনি সার্ক দেশগুলির নেতাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান এবং প্রথম বিদেশ সফরে ভুটানে যান এবং পরে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ সফর করেন।  পূর্বতন সরকারগুলির নীতির তুলনায় এই নীতির পার্থক্য হল প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রীর সফর ভারতের কাছে তারা যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা তুলে ধরা। ২০১৪ সালে “সবকা সাথ সবকা বিকাশ” এর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়, এন ডি এ সরকারের দ্বিতীয় কার্যকালের সময় তার পরিবর্তিত রূপ হয়ে যায় “সব কা সাথ সব কা বিকাশ এবং সবকা  বিশ্বোয়াস”।

এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয় যে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপ নয়-এটি হল সম্বৃদ্ধি ভাগ করে নেওয়া, একতরফা সুবিধা দেওয়া এবং বিশ্বাসের ঘাটতি দূর করা। ভারত এবং তার প্রতিবেশীদের মধ্যে ক্ষমতার বৈষম্যের দরুণ কখনও কখনও ভারতের প্রতিবেশীরা বাহ্যিক শক্তি আহরোণ করে। সেই কারণে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলার দায়িত্ব হতে হবে পারস্পরিক। সংযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা, জল সম্পদ একত্রিত করা, গ্রিড সংযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানী সংযোগ গড়ে তোলা ইত্যাদি মত বিষয়গুলির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয় কারণ এর ফলে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মাত্র ৬ শতাংশ, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা, অতিরিক্ত নথিপত্রের কাজ এবং খারাপ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখনও এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায় নি। কিন্তু ভারতের ঋণ সহায়তায় বিভিন্ন যোগাযোগ প্রকল্প রুপায়ণের ফলে এই অবস্থার ক্রমশ উন্নতি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শক্তি বাণিজ্য বাস্তব রূপ নিয়েছে।

ভারত বাংলাদেশে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে এবং গ্রিড সংযোগের ফলে এই বাণিজ্যের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। অনুরূপভাবে বাংলাদেশ ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে। নতুন দিল্লী নেপালে বিনিয়োগেরও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পরিকাঠামো এবং  যুদ্ধ ও বিপর্যয়-বিধ্বস্ত অঞ্চলে পুনর্নিমাণের কাজকর্ম ছাড়াও ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির আমলাদের এবং সসস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধির কাজের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে। ভারত এই অঞ্চলের বহু-দেশীয় এবং দ্বিপাক্ষিক যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়ে থাকে।

ভারতের প্রতিবেশীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতকে যুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। স্থল-বেষ্ঠিত দুটি দেশ নেপাল এবং ভুটান তাদের বাণিজ্য  সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরগুলি ব্যবহারে আগ্রহী। তারা তাদের জ্বালানী বাজার বহুমুখী করতে উৎসাহী। কাঠমন্ডু এবং থিম্পু অনুধাবন করতে পেরেছে যে ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ফলে তারা উপকৃত হবে। মালদ্বীপ এবং ভুটানও তাদের “প্রথমে ভারত” নীতির ওপর জোর দিয়েছে।  বাংলাদেশ মনে করে বিশ্বাস এবং সর্বাত্মক ব্যবস্থা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মৌলিক উপাদান এবং সেখানে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা হল মূল চাবিকাঠি।

ভারত এই অঞ্চলে এক আপোষরফার ভূমিকা পালন করতে পারে। এই অঞ্চলের দেশগুলি সন্ত্রাসবাদকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে গ্রহণ করেছে। যদিও এই অঞ্চলের দেশগুলির কাছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তবে বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীর গুরুত্বকেও কোনোভাবেই খাটো করে দেখা যাবে না-কারণ সেগুলিও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সার্ক, বিমস্টেক, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল  বি বি আই এন এবং বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থাৎ বি সি আই এম  অর্থনৈতিক করিডোর ইত্যাদি গোষ্ঠীগুলির আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি সাধনের নিরিখে দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের রূপান্তর ঘটানোর প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে । তাই আগামী দিনের একমাত্র পথ হল মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য নিরন্তরভাবে কাজ করে যাওয়া। (মূল রচনাঃ ডঃ স্মৃতি এস পট্টনায়ক)