ট্রাম্পের দ্বি-রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা

For Sharing

মাথার ওপর পদ থেকে অপসারণের ঝুলন্ত খাড়া এই পরিস্থিতিতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইস্রায়েলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ইস্রায়েল-প্যালেস্টাইনের বিষয়ে একটি শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। শান্তি ও সমৃদ্ধি শীর্ষক ১৮০ পৃষ্ঠার এই নথিতে প্যালেস্টাইন  এবং ইস্রায়েলী জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে চাওয়া হয়েছে। মূলত ইস্রায়েলী আধিকারিক এবং আরব নেতাদের নিয়ে  এই  আলোচনায় মধ্য প্রাচ্যের জন্য রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের নির্ধারিত ব্যক্তি জারেড কুশনার এই পরিকল্পনার সম্ভাব্য সুবিধাভোগী ফিলিস্তিনীদের এড়িয়ে গেছেন।

রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প একে একটি বাস্তব শান্তি পরিকল্পনা এবং ফিলিস্তিনীদের শেষ সুযোগ  বলে অভিহিত করেছেন। শ্রী নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনাকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন। এতে ফিলিস্তিনীদের স্বায়ত্ব শাসনের বৈধ ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তবে জেরুজালেম ইস্রায়েলের অবিভক্ত রাজধানী থাকবে এবং ফিলিস্তিনীরা পূর্ব জেরুজালেমের আল-কাদস বা অন্য কোনো শহরকে তাদের রাজধানী স্থাপন করতে পারেন। পরিকল্পনার সঙ্গে সংলগ্ন প্রাথমিক মানচিত্রে পশ্চিম তীরের ইহুদী বসতিগুলিকে ইস্রায়েলী অধিকৃত বলে দেখানো হয়েছে এবং এই ধরণের কাজের মার্কিন সমর্থন রয়েছে। ইস্রায়েল জর্ডান উপত্যকাও দখল সংযোজিত করতে পারে যার স্বীকৃতি দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।ফিলিস্তিনীদের সগ্নে ইস্রায়েলের ভূখন্ডগত পরিবর্তনের ফলে ১৯৬৭র লড়াইয়ের সময় ফিলিস্তিনী ভূখন্ড ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না যে ইস্রায়েল এমন কোনো ফিলিস্তিনী সরকারের সঙ্গে আলোচনায় রাজী থাকবে যারা হামাস সদস্য বা অন্য কোনো গোষ্ঠীকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করবে বিশেষ করে  যতক্ষন না তারা অহিংসার প্রতিশ্রুতি দেয়, ইস্রায়েলকে রাষ্ট্র হসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং গাজা ভূখন্ড সংক্রান্ত শর্তাবলী মেনে নেয়।

বসতি গুলির সংযুক্তির ফলে পশ্চিম তীরে আঞ্চলিকভাবে বিতর্কিত ফিলিস্তিনী রাষ্ট্রের সৃষ্টি হবে এবং প্যালেস্টাইনের অন্য অংশ গাজা ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে অত্যাধুনিক পরিকাঠামো সমাধানের মাধ্যমে সম্ভবত ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গ নির্মাণ করাও হতে পারে।

১৯৪৮ সালের পরে যারা আরব দেশগুলি থেকে যে সমস্ত ইহুদী ইস্রায়েলে এসেছে তাদের প্রশ্ন উত্থাপন করে পরিকল্পনায় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যে ফিলিস্তিনী শরনার্থীদের ভবিষ্যত ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র, আয়োজক দেশগুলি বা ৫৭ সদস্যের ইস্লামিক সহযোগিতা সংগঠনে  গ্রহণ করা হবে, ইস্রায়েলকে ফিলিস্তিনী শরনার্থীদের গ্রহণ করতে বলা হবে না। চার বছরের জন্য নতুন বসতি নির্মাণ বন্ধ থাকবে এবং সেই সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনীরা ইস্রায়েলের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে। একাধিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে যাতে আনুমানিক ব্যয় হবে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সব পরিকল্পনার মাধ্যমে প্যালেস্টাইন এবং জর্ডান এবং লেবাননের মত দেশকে সহায়তা করা হবে। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের বোঝা ভাগ করে নেওয়ার যুক্তির প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা ব্যয়ভার বহন করতে হবে না কারণ তা করবে জ্বালানী সমৃদ্ধি আরব দেশগুলি।

এর ভাল দিক গুলি হল ফিলিস্তিনী স্বশাসনের সমর্থন, ইস্রায়েলী বসতি নির্মাণ বন্ধ হওয়া এবং ফিলিস্তিনী রাষ্ট্রের প্রতি  অর্থনৈতিক দৃষ্টিপাত। তবে ফিলিস্তিনীরা সর্বান্তকরণে এই চুক্তি খারিজ করেছে। ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাব ক্ষমতা দখলের সময় থেকে তিনি যে সব ব্যবস্থা ঘোষণা করে এসেছেন তারই পরবর্তী পদক্ষেপ।

সৌদি আরব এবং মিশরের মত আরব দেশগুলি সতর্কতার পথ অবলম্বন করেছে কারণ আগে থেকেই তারা নানান সমস্যায় জর্জরিত। তবুও তারা ইস্রায়েল এবং প্যালেস্টাইনের মধ্যে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছে। ভারত ইস্রায়েল-প্যালেস্টাইন প্রশ্নের  প্রতি নরন্তর সমর্থন জানিয়ে আসছে এবং এই প্রশ্নের দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। নতুন দিল্লী তাদের অবস্থানের প্রতি পুনরায় জোর দিয়ে বলেছে যে দুটি পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত অবস্থা স্থির করতে হবে এবং তা উভয়র কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো প্রস্তাব নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার জন্য দুটি দেশকে অনুরোধ জানিয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য গ্রহনোযোগ্য দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পথ খুঁজে বার করতে বলেছে।

ফিলিস্তিনী জাতীয় কর্তৃপক্ষ, বৈধ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত ফিলিস্তিনী নেতৃত্ব এই পরিকল্পনার অংগ নয়। সেটাই হল আসল সমস্যা। সংক্ষেপে ট্রাম্পের মধ্য প্রাচ্য পরিকল্পনা ডেনমার্কের রাজপুত্র ব্যতিরেকে হেমলেট বৈ আর কিছু নয়।  (মূল রচনাঃ অধ্যাপক পি আর কুমারস্বামী)