ইতিহাসের পাতায় শাহপুর জাট  

For Sharing

জয়ন্ত ঘোষাল

শ্রীচরণেষু

বাবা, 

নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় অনেক দিন লেখা হয় নি। এবার দিল্লীতে শীতটাও খুব জাঁকিয়ে পড়েছে। খবরের কাগজে পড়লাম ১০৭ বছর আগে একবার এরকম ঠাণ্ডা পড়েছিল। আজ খুব ঝকঝকে রোদ উঠেছে। কাঁপুনি দেওয়া শীত আর নেই। সোনালি রোদ উপভোগ করতে রোদে বেড়িয়েছি।  হাঁটছি, গন্তব্য এক দিল্লীর পুরনো গ্রাম শাহপুর জাট। পুরনো সিরি ফোর্টের ধ্বংসাবশেষের গায়ে এটি একটি ছোট গ্রাম। সময়ের দোলায় এই গ্রামটি আজ বেশ শহুরে গ্রাম হয়ে উঠেছে। ছোট্ট ছোট্ট গলি। একদিকে নানা রকমের বুটিক শপ, ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ আবার অন্যদিকে সুপ্রাচীন পুরাণের কাহিনীর প্রতিচ্ছবি।  শাহপুর জাটের আধুনিক ইতিহাস ৯০০ বছরের। বর্তমান হারিয়ানার ইন্দ্রি নামের গ্রাম থেকে ডাগোর সমাজ এখানে এসে এই বসতি গড়ে তোলে। এখানকার মাটি ছিল খুবই উর্বর। তাই এই ডাগোর জনসমাজ এখানে চাষ আবাদ শুরু করে। তাই কম সময়ের মধ্যেই তাঁরা বেশ ধনী হয়ে ওঠে। তাদের দেখাদেখি আরও নানা ধরণের জাতের মানুষ এখানে আসতে শুরু করে। সিরি ফোর্ট দেওয়াল যখন ভেঙ্গে যায় এবং এটি বসবাসের অযোগ্য এক বাতিল কেল্লায় পরিণত হয়, তখন এখানে এসে থাকতে শুরু করে জাটেরা। জাট ছাড়াও বানিয়া, বাল্মিকী আর গুজ্জররাও এখানে নির্ভয়ে বসবাস শুরু করে। ধনী সমাজের পাশাপাশি শাহপুর জাটের গলিতে আজ বিদেশীরাও এসে থাকতে শুরু করেছে। সবুজের আস্তরণের মাঝে দূর্গের ধ্বংসাবশেষ এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ  তৈরি করে।   

আমি হাঁটছি, খেলগাঁও মার্গ থেকে গলি দিয়ে এই গ্রামের ভেতরে ঢুকছি। চারপাশে জামা কাপড়ের বুটিকের দোকান। মেয়েদের রঙ্গিন শাড়ি, এমনকি সারি সারি লেহেঙ্গা ঝুলছে। বিয়ের বাজার করার ভিড়।  

হাঁটছি । দুদিকে প্রাচীন হাভেলি। হাভেলির মধ্যে রেস্তোরা, বুটিক, প্রকাশনা সংস্থার অফিস। এ এক অদ্ভুত মিশ্র সংস্কৃতি। বিখ্যাত বহু ব্রান্ডের দোকান। এরই মধ্যে দেখলাম একটা ছোট চায়ের দোকান। এখানে এসে বসলাম – “ভাইয়া, এক চায়ে  তো পিলাহ্‌ দো। হাঁ, হাঁ, কুল্লহর মে হি দো’। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে দেখলাম বেঞ্চিতে বসে আছে জে এন ইউ আর আই আই টি’র ছাত্রছাত্রীরা। ওরা চা খাচ্ছে। অনেকে ম্যাগি। কেউ আবার ডিমের ওমলেটও খাচ্ছে। এখান থেকে জে এন ইউ ক্যাম্পাস দূরে নয়। হাউস খাস তো এই বাজারের ঠিক উল্টো দিকেই। এখানে ছাত্ররা সস্তায় ঘর ভাড়া পায়। পেয়িং গেস্ট ফেসিলিটিও রয়েছে এখানে। অনেকে আবার একটা ঘর ভাড়া নিয়ে তিন চার জন একসঙ্গে থাকে। তারাও আড্ডায় এসেছে। সব মিলিয়ে বেশ মজার পরিবেশ।    

এখানে এসে হটাৎ মনে হচ্ছে রিপোর্টার কর্মজীবনে ল্যুটেনস দিল্লির নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লক, কৃষি ভবন, রাজনৈতিক দলের দপ্তর – এসব জায়গায় ঘোরাঘুরি করেই বেড়িয়েছি। এখানে আছে সরকারি দুধ-সাদা বাংলো, সামনে পেছনে সবুজ লন; লনে ময়ূর ঘুরছে, বড় বড় সুউচ্চ গাছ, সাজানো বাগান – এ এক ভি আই পি জগৎ। এখানে গরীব মানুষদের দেখা যায় না।  

কিন্তু আজ এই শাহপুর জাটে এসে মনে হচ্ছে, এই কর্মজীবন থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা বড় ভালো। এখানে যেমন মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস থেকে শুরু করে ব্রিটিশ যুগের গন্ধ পাওয়া যায়, সেরকমই আবার আধুনিক ফরাসী বুটিক, ইতালিয়ান খাবারের দোকান, আধুনিক মিনি স্কার্ট পরা মহিলাদের শপিংও দেখতে পাওয়া যায়। 

ভাঙ্গা কেল্লার পাশে একটা প্রাচীন মসজিদ। তারপাশে সবুজ মাঠ। মাথার ওপরে ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশ। 

আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই কাহিনী স্মরণ করছি। হাঁটতে হাঁটতে এই গ্রামে যখন ঢুকছি তখন আলাউদ্দিন খিলজির মধ্যযুগের দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখছিলাম। ইটের শরীর। লাল হলুদ পাথর। নানা আকৃতির প্রাচীর। আমি সেই ইটের ওপর হাত বোলাচ্ছি। কি অদ্ভুত! এরই মধ্যে একটি মিষ্টান্ন ভান্ডার দেখলাম। লোকে গরম গরম সিঙ্গারা খাচ্ছে। আরও একটু এগোতেই দেখি প্রতিমা বিকাশ বালিকা বিদ্যালয়। প্রাচীন ও আধুনিক – দুই সময়ের এমন সংমিশ্রণ। ধনী ও দরিদ্রের এমন সমাবেশ অভাবনীয়। 

তবে শাহপুর জাট নিয়ে মুখে মুখে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। স্থানীয় বহু প্রবীণ মানুষের বিশ্বাস যে, এই এলাকায় এক প্রবল পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন। এটা নাকি পাণ্ডবদের সময়েরও আগে। যমুনার পশ্চিম তীরে এই বিশাল এলাকার রাজা ছিলেন ৮২ বছরের প্রবীণ কার্তার সিং। এক দেহাতি, চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে বললেন, পাণ্ডবরা ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মাণের জন্য এখান থেকেই তো সব পাথর নিয়ে যেত।  

এই গায়ের দোকানের পাশেই একটা দেওয়ালে লাগানো আয়না। সামনে লম্বা চেয়ার। নাপিত চুল কাটছে। বাচ্চা ছেলেকে চুল কাটতে নিয়ে এসেছে তার ঠাকুমা। পাথরের স্ল্যাবে বসে দুর্গা দেবী বললেন, সেই কোন ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে এ গ্রামে এসেছিলেন তিনি। না, সাল টাল কিছুই আজ মনে নেই। শুধু মনে আছে কত চাষ হত এখানে। কত শাক সবজি। কত জল ছিল। তারপর হটাৎ জলের সংকট হল। চাষ শুকিয়ে গেল। অনেক দূর থেকে দুর্গা দেবী জল নিয়ে আসতেন। 

সব অনিত্য। অনিত্যই এ সংসারের একমাত্র নিত্য। আজ এখানেই শেষ করছি।

তোমার

হরিদাস।