অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট-২০২০ 

For Sharing

সংসদের উভয় সভার যৌথ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দের অভিভাষণের মধ্য দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবর্ষের বাজেট অধিবেশন শুরু হল। এর পরেই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ সংসদে অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট পেশ করলেন। একটি অর্থ বর্ষে দেশের  অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের অর্জিত সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার একটি সামগ্রিক প্রতিফলন হল এই অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট। সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় অর্থব্যবস্থায় মন্দা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ২০২০’র এই সমীক্ষা রিপোর্ট বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই রিপোর্টে ২০১৯-২০ অর্থ বর্ষে ৫ শতাংশ বিকাশ হার অর্জনের পূর্বাভাষ দেওয়া হয়েছে। তবে শীঘ্রই অর্থব্যবস্থায় তেজী ভাব ফিরে এসে ২০২০-২১ অর্থবর্ষে ৬ থেকে সাড়ে ছয় শতাংশ বিকাশ হার অর্জন করা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। 

২০২০’র অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় অর্থব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো শক্তিশালী রয়েছে, এবং এর প্রেক্ষিতে আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ তিন দশমিক তিন শতাংশের মধ্যেই সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ মুদ্রাস্ফীতির হার খুচরো বাজারে চার দশমিক এক শতাংশ ও পাইকারি বাজারে মাত্র এক দশমিক নয় শতাংশ স্তরেই  সীমিত রয়েছে। বৈদেশিক লেনদেন খাতেও দেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই লেনদেনের চলতি খাতে ঘাটতির পরিমাণ দুই শতাংশ থেকে কমে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ হয়েছে। একদিকে আমদানি হ্রাস পাচ্ছে,অন্য দিকে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ-FDI, বৈদেশিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ- FII ও অনাবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। চলতি অর্থ বছরের প্রথম আট মাসে মোট FDI এসেছে ২৪৪৪ কোটি মার্কিন ডলার। চলতি অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসে অনাবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৮৪০ কোটি মার্কিন ডলার।  দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের পরিমাণও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এ মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী এই পরিমাণ প্রায় ৪৬১২০ কোটি মার্কিন ডলার। 

অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের সংগঠিত উৎপাদন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান গত পাঁচ বছর সময়ে ১৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শেয়ার বাজারেও ক্রমশ তেজীভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন নতুন ব্যবসায়িক সংস্থা এই বাজারে প্রবেশ করছে, যা অর্থনৈতিতে  বিনিয়োগ কারীদের আস্থাই সূচিত করছে। 

বিশ্ব ব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, নতুন নতুন শিলোদ্যোগের সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বে ভারত তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। ২০১৮ সালে প্রায় ১২৪০০০ নতুন উৎপাদন সংস্থা সৃষ্টি হয়েছে, ২০১৪’এ যে সংখ্যা ছিল মাত্র ৭০,০০০। ২০০৬ থেকে ২০১৪’র মধ্যে নতুন উৎপাদন সংস্থার সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৩.৮ শতাংশের মত। অপরদিকে ২০১৪ থেকে ২০১৮’র মধ্যে এর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২.২ শতাংশ। শিল্প ক্ষেত্রে বিশ্বে ভারতের স্থানকে সুদৃঢ় করতে মেক-ইন-ইন্ডিয়া’র পাশাপাশি ‘অ্যাসেম্বল-ইন-ইন্ডিয়া- ফর- দ্য- ওয়ার্ল্ড’ স্লোগান’এর আওতায় দেশের রপ্তানি ক্ষেত্রকে উৎসাহ দানের লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভারত যাতে আগামী ২০৩০’এর মধ্যে বিশ্বে এক বড় মাপের রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে , সেই লক্ষ্যে উৎপাদন ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উপযুক্ত গুণমান সুনিশ্চিত করার বিষয়েও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার আগামী পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে দেশের অর্থব্যবস্থাকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থব্যবস্থার স্তরে নিয়ে যাবার যে লক্ষ্য মাত্রা ধার্য করেছে, সেই অনুযায়ী এই অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্টে দেশে একটি ব্যবসায়ী ও শিল্প বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পরিচয় তুলে ধরতে চাওয়া  হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত সহজে ব্যবসার অনুকুল পরিবেশের নিরিখে প্রস্তুত দেশগুলির তালিকায় ভারতের ক্রমোন্নতি তারই পরিচয় বহন করছে। ভারত এখন এই তালিকায় ৬৩ নম্বরে উঠে এসেছে। ২০১৪’তে এই স্থান ছিল ১৪২।  

সংক্ষেপে বলতে গেলে,  শিল্প ও ব্যবসা অনুকূল নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে অর্থব্যবস্থায় সামগ্রিক আস্থার পরিবেশকে ক্রমশ শক্তিশালী করার সংকল্পই ২০২০’র অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্টে ব্যক্ত করা হয়েছে।  (মূল রচনাঃ- মনোহর মনোজ )