ব্রেক্সিট, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতের ওপর তার প্রভাব

For Sharing

ব্রিটেন ২০১৬’য় ব্রেক্সিটের বিষয়ে গৃহীত গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুসারে ৩১শে  জানুয়ারি ২০২০ ইউরোপীয় ইউনিয়ন – ইইউ থেকে সরে দাঁড়ানোর ফলে উভয়ের মধ্যে দীর্ঘ ৪৭ বছরের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটল।

ব্রিটেন ১৯৭৩ সালে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল। অন্যদিকে লিসবন চুক্তির ৫০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নিয়মানুসারে ইইউ থেকে সরে আসা প্রথম সদস্য দেশও হল ব্রিটেন।

একভাবে না হলেও বেক্সিটের প্রভাব ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ের ওপরেই পড়বে। ব্রেক্সিটের সমর্থকরা মনে করেন, এর ফলে ব্রাসেলসের প্রভাবমুক্ত হয়ে ব্রিটেনের জাতীয় শক্তি পুণঃঅর্জিত হবে, দেশ আরো মজবুত হবে এবং বিশ্বজনীন ব্রিটেন হয়ে ওঠার পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। তবে এটা স্পষ্ট যে এই সফর সহজ হবে না। ব্রিটেনকে নতুন করে বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার অর্জন করতে হবে এবং বাণিজ্যিক চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে হবে। ইইউ’এর থেকে সরে আসার প্রভাব শ্রমিকের যোগান, মূলধন এবং পরিষেবা  সর্বক্ষেত্রের ওপরেই পড়বে। এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রিটেনের বৃহত্তম আমদানি ও রপ্তানি বাজার হওয়ায়, ব্রেক্সিটের পর বাণিজ্য সংক্রান্ত  এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসছে যার জন্য প্রয়োজন নতুন করে চুক্তি সম্পাদন নতুবা বিভিন্ন শুল্ক বা কোটার ফলে উভয় পক্ষের বাণিজ্যই বিঘ্নিত হতে পারে।

অন্যদিকে ইইউ’এর সামগ্রিক শক্তির ওপরেও বিভিন্ন দিক থেকে ব্রেক্সিটের প্রভাব পড়ছে। ব্রিটেন ছিল ইইউ’এর  দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থপ্রদানকারী দেশ, UNSC’র অন্যতম স্থায়ী সদস্য তথা পরমাণু শক্তিধর দেশ। সুতরাং শুধুমাত্র অর্থসংস্থানই নয়, ইইউ’এর বৈদেশিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতির দিক থেকেও ব্রিটেনের অনুপস্থিতি খুব শীঘ্রই অনুভব করবে ইইউ। সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তা অনুভূত হবে। তবে এর মধ্যেও ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ম্যাকরঁ আশা  প্রকাশ করেছেন যে, চ্যানেল যেমন তাদের ভাগ্যকে আলাদা করতে পারে নি, তেমনই ব্রেক্সিট তা করতে পারবে না।

ব্রেক্সিট হলেও তা সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করার জন্য সময় পর্ব শেষ হবে ৩১শে ডিসেম্বর। এটি সমস্ত প্রক্রিয়াকে সহজ করার জন্য এবং বাণিজ্য ও বাজারে প্রবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলির সমাধানের জন্য রাখা হয়েছে। ব্রিটেন ইতিমধ্যেই  জানিয়ে দিয়েছে যে ইইউ নিয়মাবলীর কোনও সমন্বয় হবে না এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তারা ইউরোপীয় আদালতের দ্বারস্থ হবে না।

এই প্রেক্ষিতে ভারত-ব্রিটেন সম্পর্কও নতুন মাত্রা পাবে। ব্রিটেন যেহেতু বাণিজ্য  সম্পর্ক প্রসারের প্রয়াস নিচ্ছে, লন্ডনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বিষয়ে আলোচনার জন্য ভারতের কাছে এটি একটি নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শিল্পপতি লর্ড করণ বিলিমোরিয়া বলেছেন, ভারতকে এজন্য কর্পোরেট কর হ্রাস করতে হবে, তথ্যের গোপনীয়তা সুনিশ্চিত করা এবং ব্যবসা বাণিজ্যের প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারত ও ব্রিটেনের এই অংশীদারিত্বে প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক পরিষেবা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের যথেষ্ট সম্ভবনা রয়েছে। রাজনৈতিক স্তরে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব নতুন স্তরে উন্নীত করার জন্য ইতিমধ্যেই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটেনে ভারতীয় ব্যবসার ক্ষেত্রে ইইউর বাকী অংশে তাদের অবাধ প্রবেশাধিকার   এখন থাকবে না। ফলে স্থান পরিবর্তন অথবা রপ্তানি শুল্ক  প্রদান সব ক্ষেত্রেই  তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করতে হবে। সুতরাং উভয়পক্ষের জন্যই ব্যবসা বাণিজ্যের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের বিষয়টির সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ  ইইউ’র বাজারের প্রবেশাধিকার হারানোয় তাদের সামনে থাকবে ব্রিটেনের সঙ্কুচিত বাজার।

রাজনৈতিক স্তরে ব্রিটেন কমনওয়েলথের মতো অন্যান্য মঞ্চের মাধ্যমে সম্পর্ক  জোরদার করার চেষ্টা করবে, যা নয়াদিল্লির জন্যেও লাভজনক হবে।  আরও  গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতকে পরিষেবা ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বাজারে প্রবেশাধিকার  এবং শ্রমিক সংক্রান্ত বিষয়গুলির জন্য আরও ভাল শর্তাদি খুঁজে দেখার প্রয়াস নিতে হবে। ২০২০ সালের শেষ পর্যন্ত ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের আলোচনার চূড়ান্ত পর্ব চলবে। ভারত সরকার এবং বাণিজ্যমহলকে এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করতে হবে এবং ব্রিটেনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব পুণর্বিন্যাসের লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতিকৌশলের বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে।

( মূল রচনাঃ উম্মু সালমা বাভা )