ভারত ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যে সম্পর্কে উন্নতি 

For Sharing

তুর্কমেনিস্তানের মন্ত্রী সভার ডেপুটি চেয়ারম্যান তথা বিদেশ মন্ত্রী রশিদ মেরেডোভ সম্প্রতি ভারত সফর করলেন। এই সফরে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় নেতার মধ্যে  দ্বিপাক্ষিক এবং আঞ্চলিক বিষয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জনিয়েছেন, এই আলোচনায়  আঞ্চলিক বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

তুর্কমেনিস্তান, পূর্ববর্তী সোভিয়েত রাশিয়া থেকে আলাদা হওয়া মধ্য এশিয়ার ৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে একটি।  ভারত মধ্য এশিয়াকে বৃহত্তর  প্রতিবেশী হিসেব গণ্য করে। তুর্কমেনিস্তানের ভৌগলিক অবস্থানের ফলে এই অঞ্চলটি আন্তঃ আঞ্চলিক ক্রিয়াকলাপে একটি প্রধান দেশ হিসেবে গড়ে উঠেছে। তুর্কমেনিস্তান একদিকে  দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়াকে সংযুক্ত করেছে আবার অন্যদিকে এর দক্ষিণে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র আফগানিস্তান এবং পশ্চিমে ইরান। মধ্য এশিয়ায়  এই রাষ্ট্রের  প্রতিবেশী দেশ হল  কাজাকস্তান এবং উজবেকিস্তান। তুর্কমেনিস্তানে কাসপিয়ান সমুদ্র উপকূল রয়েছে যার ফলে এটি ইউরেশিয়া এবং ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হয়। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি তুর্কমেনিস্তানের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬ সালে তুর্কমেনিস্তানে ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সর্ববৃহৎ বিমানবন্দর গড়ে তোলা হয়েছে।

জনসংখ্যার  দিক থেকে তুর্কমেনিস্তান ছোট দেশ হলেও এর আর্থিক বিকাশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, তুর্কমেনিস্তানের জনসংখ্যা  ৬ মিলিয়ন। তুর্কমেনিস্তান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ভান্ডার। তেল, সালফার এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধশালী এই দেশ। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে এই দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য উৎপাদন GDP প্রায় ৪০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তুর্কমেনিস্তানের  রাষ্ট্রপতি গুরবাঙ্গুলি বার্ডিমুহমাদভের প্রশাসন, অর্থনীতির বৈচিত্র্য আনার  চেষ্টা করছে এবং তেল ও গ্যাস, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন ও যোগাযোগের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র যেমন রাসায়নিক, টেলিযোগাযোগ এবং অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান কার্যক্রমের দিকে মনোনিবেশ করেছে। এছাড়া, ২০১৯-২৫ সালের মধ্যে  ডিজিটাল অর্থনীতি কার্যক্রম রূপায়ণেরও চেষ্টা করছে।

তুর্কমেনিস্তান বিশ্ব সম্পর্কের ক্ষেত্রে  ‘স্থায়ী নিরপেক্ষতা’ নীতি অনুসরণ করে। ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদে এই নীতিকে  সমর্থন করা হয়েছে। ভারত এই সম্পর্কিত প্রস্তাবের  সহ পৃষ্ঠপোষক ছিল এবং বর্তমানে আশগাবাদ  ২৫তম বার্ষিকী উদযাপন করছে।

তুর্কমেনিস্তানের অনন্য ভৌগলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্য এই দেশ ভারতের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক  দিক থেকে ভারত ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যে  যুগ প্রাচীন সম্পর্ক রয়েছে। বিখ্যাত ‘সিল্ক রুট’-এর মাধ্যমে  দুটি সভ্যতার মধ্যে সংযোগ ঘটেছিল। মধ্যযুগে সে দেশ থেকে বিদগ্ধজনেরা ভারতে আসায় এই সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। ত্রয়োদশ শতকে প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ তুর্কমান বায়াবনি ভারতে বসবাস করেছিলেন। সপ্তদশ শতকে তাঁর নামানুসারেই দিল্লির বিখ্যাত ‘তুর্কমান গেট’ নির্মিত হয়েছিল। সম্রাট আকবরের পরামর্শদাতা বৈরাম খানও ছিলেন তুর্কমেনিস্তানের বংশোদ্ভূত।

ভারত ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যে সুদৃঢ় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। তুর্কমেনিস্তানের রাষ্ট্রপতি গুরবাঙ্গুলি বার্ডিমুহমাদভ ২০১০ সালে ভারত সফরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৫ সালের জুলাই মাসে সে দেশ সফর করেন। সে সময় দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক পত্র MoU স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর সফরকালে সে দেশে ঐতিহ্যগত ওষুধ এবং যোগ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন।

এই দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সুসম্পর্ক সত্বেও  দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক ততটা মজবুত ছিল না। ২০১৮-১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমান ছিল ৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দুই দেশের মধ্যে সম্ভাবনার বিষয়ে  উপযুক্ত তথ্যের অভাব এবং ভারত ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে সরাসরি স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবই এর কারণ বলে মনে করা হয়। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সম্পর্কে আফগানিস্তানের অস্থিরতাও একটি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় দেশ আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী।

যদিও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও প্রশস্ত করার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।  ভারত, ইরানের চাবাহার বন্দরে বিনিয়োগ করছে। তুর্কমেনিস্তান ও কাজাকস্তানের সঙ্গে ইরানের রেল যোগাযোগ রয়েছে। ইরানের রেল পথের সঙ্গে চাবাহার বন্দরকে সংযোগ করা হলে তুর্কমেনিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে। ২০১৮ সালে ভারত আশগাবাদ চুক্তিতে যোগ দিয়েছে, যার ফলে  পশ্চিম এশিয়া থেকে তুর্কমেনিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং উজবেকিস্তানের   মধ্য দিয়ে  ইরান এবং ওমানের সঙ্গে  একটি আন্তর্জাতিক পরিবহন এবং ট্রানজিট করিডোর তৈরি হয়েছে।

একইভাবে সম্প্রতি তুর্কমেনিস্তান- আফগানিস্তান- পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে (TAPI) প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপ লাইনের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। ২০১২ সালে ক্রয় এবং বিক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তুর্কমেনিস্তান জানিয়েছে, TAPI প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনেই চলছে এবং আফগানিস্তানে ২০১৮ সালে নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তাই ভারত- তুর্কমেনিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে প্রশস্ত হতে চলেছে বলেই আশা করা যায়।

( মূল রচনাঃ ডঃ আতহার জাফর)