মুঘল গার্ডেন

For Sharing

চৈতালি দাস 

 

প্রিয় মৈত্রী, 

 

আজ তোকে চিঠি লিখতে বসার কারণটা জানলে তুই খুব খুশী হবি আমি জানি। ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস ছিল তোর প্রিয় বিষয়। বাংলার মনীষীরাও তোর  খুব প্রিয় ছিলেন। অবশ্য শুধু তোরই বা কেন ? বাংলার মনীষীরা সকলের প্রিয়। 

এবার  বলি ,আজ আমি রাজা রাম মোহন রায়ের সঙ্গে দেখা করে এলাম।

কি রে? চমকে গেলি? যে রাজা রাম মোহন রায় প্রায় ১৮৭ বছর আগে ইহলোক ত‍্যাগ করেছেন , তাঁর সঙ্গে  মুখোমুখি বসে কি করে গল্প করলাম?

শোন তাহলে ব‍্যাপারটা তোকে খুলেই বলি-


৫ ই ফেব্রুয়ারি দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের ঐতিহাসিক মুঘল গার্ডেন সকলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ফ্রেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে মুঘল গার্ডেন তার ফুলের সম্ভার নিয়ে সেজে ওঠে দর্শকদের জন্যে । প্রায় একমাস খোলা থাকে এই বাগান। এই বছর ৮ ই মার্চ পর্যন্ত  সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত খোলা থাকবে এবং প্রতি সোমবার বন্ধ থাকবে এই মুঘল গার্ডেন।

আজ আমি আর আমার আর এক বন্ধু ঘুরে এলাম মুঘল গার্ডেনে। 

মুঘল গার্ডেনে ঢুকতেই  কানে এলো সানাইয়ে  বন্দেমাতরমের সুর। একটু এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম মিউজিকাল গার্ডেন। ২০০৫ সালে এই মিউজিকাল গার্ডেনটি তৈরী হয়। যার মধ্যে অনেকগুলো ফোয়ারা সানাইয়ের সুরের সঙ্গে তালে তালে ওঠা নামা করছে নৃত্যের ভঙ্গিমায়।  এত সুন্দর দৃশ্য ছেড়ে এগিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও এগোতেই হলো । মিউজিকাল গার্ডেনের পরেই দেখলাম বনসাই গার্ডেন। আনুমানিক ৩০০ রকমের বনসাই আছে এই বাগানে। বনসাই দেখার পর এগিয়ে গেলাম মূল বাগানের দিকে। মুঘল গার্ডেনের স্থাপত্যশৈলী মুঘল স্থাপত্যকলার অনুকরণে তৈরি ।  এই বাগান সম্পূর্ণ সমতল নয়। কোথাও কিছুটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হয়, আবার কোথাও কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে নীচের ধাপে নামতে হয়। একটা জরুরী কথা তোকে বলি এই বাগানের সংরক্ষণ এবং সুরক্ষার জন্য এখানে জলের বোতল, খাবার জিনিস, সুটকেস ,বড়ো পার্স , রেডিও ইত্যাদি নিয়ে গার্ডেনের ভিতরে প্রবেশ নিষেধ। শুধু মোবাইল নিয়ে প্রবেশের অনুমতি আছে।

 

বনসাই গার্ডেন দেখার পর কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে যখন রাষ্ট্রপতি ভবনের ডোম আকৃতির চূড়ায় ভারতবর্ষের পতাকা দেখতে পেলাম তখন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আরো কয়েক পা এগিয়েই পুরো রাষ্ট্রপতিভবন আমাদের চোখের সামনে উজ্জ্বল উপস্থিতি নিয়ে হাজির হলো।  আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল তখন।  বিশ্বের সবথেকে বড়ো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি তা নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক চমৎকার নিদর্শন এই রাষ্ট্রপতি ভবন। যার সামনে অজস্র রঙ বেরঙের ফুল, সবুজ দুর্বা ঘাসের মখমল কেউ যেন  বিছিয়ে দিয়েছে  পুরো বাগান জুড়ে। ফুলের মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে কত রঙের প্রজাপতিরা। এই দৃশ্য এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে আমার চোখের সামনে। 

ওখানেই দেখা হয়ে গেল রাজা রাম মোহন রায় নামের ফুলের সঙ্গে । অপূর্ব  সুন্দর এই ফুল। মনে হলো বাংলায় সতীদাহ প্রথার বিলুপ্তকারী নবজাগরণের জনক যেন শীতের দুপুরে পিঠে রোদ দিয়ে বসে আছেন। আমাদের মত দুই বঙ্গসন্তানকে দেখে তিনি যেন খুশী হয়ে দুলে দুলে আমাদের স্বাগত জানালেন। শুধু রাজা রাম মোহন রায়ই নয় আরো দুই বঙ্গ সন্তানের নামে প্রসিদ্ধ এই বাগানে ফুলের  নাম রাখা হয়েছে- তাঁরা হলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখপাধ্যায় এবং স্বাধীনতা সংগ্ৰামী শ্রী বিপিন চন্দ্র পাল।  হিসেবে সত্যিই গর্ব হচ্ছিল নিজেকে বাঙালী ভেবে। 

মুঘল গার্ডেন শুধু ভারতবর্ষই নয় ,সারা পৃথিবীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি দর্শনীয় বাগান।

দিল্লিতে রাষ্ট্রপতিভবনের ভিতর সুবিশাল ১৩ একর এলাকা জুড়ে এই বাগান রয়েছে। যেখানে এই বছর দশ হাজার রঙবেরঙের টিউলিপ, ১৩৮ প্রজাতির গোলাপ এছাড়া ৭০ রকমের মরশুমী ফুল মুঘল গার্ডেনের শোভা বর্দ্ধন করছে। নানা রঙের ফুলে আর সুগন্ধে চারিদিকে  এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গের নন্দনকাননে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি। 

এই বছরের ফুলেদের মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ ছিল ” গ্ৰেস দি মোনাকো” নামে এক বিরল প্রজাতির গোলাপ। এই গোলাপের চারাটি  মোনাকোর রাজপুত্র অ্যালবার্ট দ্বিতীয় গতবছর তাঁর ভারত সফরকালে রোপণ করেছিলেন।  

স‍্যার এডউইন ল‍্যুটেনস মুঘল গার্ডেনের নক্সা তৈরী করেন ১৯১৭ খৃস্টাব্দে এবং এই বাগান সম্পূর্ণভাবে তৈরী হয় ১৯২৮ খৃস্টাব্দ নাগাদ। মূলত‍‍ কাশ্মীরের মুঘল গার্ডেন ,পাশ্চাত্যের বাগানশৈলী এবং তাজমহলের গায়ে আঁকা বিভিন্ন বাগানের নক্সার উপর ভিত্তি করে এই মুঘল গার্ডেনের নক্সা তৈরী করা হয়।   


গোলাপ ছাড়াও এই বাগানের বিশেষ আকর্ষণ হলো টিউলিপ ফুলেরা।  বড়ো বড়ো কাপের মত টিউলিপ ফুলের রঙ এবং তার পাঁপড়ির রেশম কোমল বিন্যাস ভোলা যায় না। এই বাগানের আর একটি বিশেষত্ব হলো বোগনভেলিয়া। বিভিন্ন    রঙে এবং বিন্যাসে বাগানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে কয়েকগুণ।  

 

সম্পূর্ণ মুঘল গার্ডেন অনেক গুলো ভাগে বিভক্ত আছে।  রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে চৌকো আকারে বাগানটা মনে হলো সব থেকে বড়ো। সেখানে ফুল দেখতে দেখতে রাষ্ট্রপতি ভবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য ঘটে গেল। এরপরের বাগানটি লম্বা আকারের। এখানে গোলাপের আধিক্যই বেশি। একেবারে শেষে গোলাকৃতি বাগান। যার মাঝখানে রয়েছে সুন্দর ফোয়ারা। বাগানে ঘুরতে ঘুরতে নীলকন্ঠ পাখি, শালিখ, বুলবুলি ,হাঁড়িচাচা ,আরো কত পাখি দেখতে পেলাম।  বেশ কয়েকটা ভাল ছবিও তুলে নিয়েছি মোবাইলে।  ফুলের বাগান ছাড়াও ফলের বাগান এবং ভেষজ উদ্ভিদের বাগান দেখলাম। ভেষজ উদ্ভিদের বাগানটি আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ এ পি জে আবদুল কালামের তৈরী। 


দিল্লি ভ্রমণের জন্য এই সময়টা কিন্তু চমৎকার। তাই পর্যটকদের জন্য এই  উদ্যানোৎসবের সময় এই মুঘল গার্ডেন দেখার সৌভাগ্য একটা বড় পাওয়া।  

 তাই এ সময় রাজধানী দিল্লি বসন্তের রঙিন উষ্ণতায় পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানানোর অপেক্ষায় আছে।

আজ এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকিস।

ইতি

মিতা