নাহি ভয়

For Sharing

লিখেছেন – ডাঃ পিনাকী রঞ্জন দেবনাথ

প্রিয় মৈত্রী,

আজকে আমার চিঠির আলোচনার বিষয় হল সমগ্র বিশ্বের বিকাশের আর মানবতার শত্রু নোভেল করোনা ভাইরাসকে নিয়ে।

নোভেল করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরে। ২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা যে, উহানের সি-ফুড মার্কেটই হল এর পীঠস্থান। বাদুড়ের মধ্যে সাধারণত এই ভাইরাস থাকে যা থেকে মানব দেহে এর সংক্রমণ ঘটেছে। চীনে বাদুড়ের স্যুপ একটি অতি জনপ্রিয় খাবার। অতীতে এই করোনা ভাইরাস বেশ কয়েকবার মহামারী ডেকে এনেছে যেমন – ২০১২ সালে ‘মারস’ (MERS) বা মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম। ২০০২ সালে ‘সারস’ (SARS) বা সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম, যা মহামারীর আকার নেয়। বর্তমান ‘করোনা ভাইরাস’এর নামকরণ করা হয়েছে ‘2019ncov’ নামে। এই সমস্ত রোগগুলি বিভিন্ন করোনা ভাইরাস জনিত রোগ। করোনা ভাইরাসের প্রকারভেদ অনেক এবং এরা মানুষের ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রে আঘাত হানে।

যেহেতু এই ভাইরাস মানবদেহের শ্বাসযন্ত্রে আক্রমণ করে তাই এরা শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমেই শরীরে প্রবেশ করে। মুলতঃ এরা এয়ার ড্রপলেট বা ছোট ছোট বায়বীয় কণার মাধ্যমে মানব শরীরে প্রবেশ করে এবং শ্বাস অঙ্গের কোষিকার মধ্যে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এদের মাল্টিপ্লিকেশন বা বিভাজন ক্ষমতা অতি দ্রুত হয়। সেখান থেকে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে যাকে ভাইরেমিয়া (Viraemia) বলে।

শুধু তাই নয়, আক্রান্ত পশুর রক্ত থেকেও এদের সংক্রমণ হয় বা অপক্ক মাংস খেলেও এই রোগের সংক্রমণ হয়। তাছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিষপত্র থেকেও সংক্রমণ হয়। যদি কোন সুস্থ ব্যক্তি, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিষপত্র ব্যবহার করে বা ঐ হাত নাকে বা মুখে দেয় তাহলেও ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এই রোগের ইঙ্কুবেসন পিরিয়ড বা শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করলে পূর্ণরূপে লক্ষণ ফুটে উঠতে দু থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। শুরুতে সামান্য সর্দি কাশি বা হাঁচি দিয়ে শুরু হয়, সাথে জ্বর বা অল্প শ্বাসকষ্ট থাকতে পারে। ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট মাত্রাধিক হয় এবং শরীরে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ে। একে একিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম বলে। কারুর আবার দুর্বলতা ও ডায়রিয়াও হয়ে থাকে। রোগের প্রকোপ বাড়লে তা সেপসিস এবং মাল্টি অর্গান ফেলিয়োরের দিকেও যায়, যার ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যায় এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যে সমস্ত মানুষ ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন বা অন্যান্য রোগে আগে থেকেই আক্রান্ত তাঁদের জন্য এই রোগ আরও বেশি ক্ষতিকারক এবং এই সকল ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার খুবই বেশী।

এই রোগ নির্ধারণের জন্য প্রথমেই দেখতে হয় রোগীর কোন আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক হয়েছে কিনা বা রোগী এমন জায়গার সংস্পর্শে ছিল কিনা যেখানে এটা হচ্ছে। এই সব সন্দেহজনক ব্যক্তির রক্ত বা মুখের লালা পরীক্ষা করে সুনির্দিষ্টভাবে এই রোগ নির্ধারণ করা যায়। ভারতে পুনার ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অফ ভাইরোলজিতে এর সুনির্দিষ্টভাবে এই রোগ নির্ধারণের ব্যবস্থা আছে।

যেহেতু এই রোগের কোন প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই তাই কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনও পর্যন্ত নেই। আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয় যাকে সিম্পটম্যাটিক চিকিৎসা বলে। ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ (WHO) এই রোগ প্রতিরোধের বেশ কয়েকটি উপায় নির্ধারণ করেছে। তার মধ্যে প্রথম হল- হ্যান্ড ওয়াশিং বা হাত ধোয়া। বারবার সাবান বা অ্যালকোহল জাতীয় জিনিষ দিয়ে হাত ধোয়া। হাত ধুতে হবে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে যাতে হাতের ভাইরাসের সংখ্যা কমে যায় এবং ঐ হাত ব্যবহারে নিজের বা অন্যের সংক্রমণের সম্ভাবনা কম হয়ে যায়।

দ্বিতীয় হল রেসপিরেটরি হাইজিন। অর্থাৎ প্রত্যেকবার হাঁচি বা কাশির সময় মুখে রুমাল চাপা দেওয়া উচিত এবং সঙ্গে সঙ্গে হাত ধুয়ে নেওয়াও খুব জরুরী। মেডিক্যাল মাস্ক ব্যবহার এক অতি উত্তম উপায় কিন্তু বারবার মাস্ক বদলে নেওয়া উচিত বিশেষ করে ভিজে গেলে।

তৃতীয়ত হল সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকা। যেহেতু এই ভাইরাস বায়বীয় কণার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাই কমপক্ষে ছয় ফিট দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়।

চতুর্থ হল কুয়ারেন্টাইন বা প্রতিবন্ধকতা। আক্রান্ত ব্যক্তি বা সন্দেহজনক ব্যক্তিকে অন্তত ১৪ দিন পর্যন্ত আলাদা করে রেখে দেওয়া উচিত যাতে রোগ সংক্রমণ না হয়। কারণ শরীরে সংক্রমণ ঢুকতে বা রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে সর্বাধিক দুই সপ্তাহ সময় লাগে।
তছাড়া, মুভমেন্ট রেস্ট্রিকশন হল আর একটি উপায়। বেশী ঘোরাঘুরি না করাই ভালো, বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই ডায়বেটিস বা হাইপারটেনশন জাতীয় ব্যাধি আছে।

এছাড়া স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং মাংসজাতীয় খাবার খুব ভালো করে সেদ্ধ করে খাওয়া উচিত। পর্যাপ্ত ঘুম খুবই জরুরী যা রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ায়।

এই সব পদ্ধতি অবলম্বন করলে এই রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচা যায়।
WHO এই রোগকে ‘গ্লোবাল ইমারজেন্সি’ ঘোষণা করেছে। এখন পর্যন্ত ২৮টি দেশে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লির ‘রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল’কে এই রোগের জন্য ‘নোডাল হাসপাতাল’ ঘোষণা করা হয়েছে যেখানে ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ এবং ‘আই সি ইউ’র ব্যবস্থা করা হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির সুচিকিৎসার জন্য সব রকম ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। স্বাস্থ বিভাগ রোগের চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকাও জারী করেছে।

ভারত সরকার চীনের উহান থেকে ছ’শোরও বেশী ভারতীয়কে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। যে সমস্ত অন্তঃরাষ্ট্রীয় যাত্রী চীন হয়ে ভারতে আসছে তাঁদের ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সরকার চীনগামী যাত্রীদের জন্য বিশেষ নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে ‘থার্মাল স্ক্রিনিং’এর ব্যবস্থা করা রয়েছে। তাছাড়া সন্দেহজনক ব্যক্তির চিকিৎসা ও রোগ নির্ধারণের সুবিধা উপলব্ধ করানো হচ্ছে।

মোটকথা এই করোনা ভাইরাসকে আটকাতে সরকার বদ্ধ পরিকর। ভারত সরকার WHO-এর সাথে তালে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে । আর করবেই না বা কেন, কারণ ভারত সরকার নিজের নাগরিকদের সুরক্ষার ব্যপারে সর্বদা সচেতন। তাই – নাহি ভয়।

ইতি
মিতা