সঠিক দিশায় NAM ভার্চুয়াল শিখর সম্মেলন

For Sharing

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ জনিত পরিস্থিতি, কেবলমাত্র বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রেই নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সামনেও অভাবনীয় চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে।  আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিভিন্ন শিখর সম্মেলন হঠাৎই এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন। এই অবস্থায় আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ’এর উদ্যোগে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন- NAM’এর সম্পর্ক গোষ্ঠীর শিখর সম্মেলন অন লাইনে আয়োজন করার প্রয়াস অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল মনে করছে।  ভিডিও কনফারেন্সে সম্মেলনে যোগ দিলেন ৩০টিরও বেশি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান সহ কয়েকটি দেশের অন্যন্য প্রতিনিধি। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তাঁর ভাষণে সাম্য, ন্যায় বিচার ও মানবিকতার আদর্শের ভিত্তিতে বিশ্বায়নের নতুন এক ব্যবস্থাপনা  প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিলেন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাজকর্মে যাতে নতুন বিশ্ব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটে, তার জন্য শ্রী মোদি বিশ্ব নেতৃবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।  তিনি বলেন NAM এখনও একটি বলিষ্ঠ নৈতিক শক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক সংহতির স্তম্ভ বিশেষ। শ্রী মোদি বলেন, ভারত, এই আন্তর্জাতিক সংহতির আদর্শকে সামনে রেখেই এই করোনা অতিমারির সময়ে ১২০ টিরও বেশি দেশে জরুরি চিকিৎসা উপকরণ পাঠিয়েছে।

বিভিন্ন প্রাণদায়ী অষুধপত্র তৈরি ও স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী দেশ হিসেবে ভারত এখন আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার দেশ সহ বিশ্ব বাজারে সুলভে ওষুধপত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই কারনেই আজকের দিনে ওই সব অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার বিশাল সংখ্যক নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ভারত থেকে ন্যায্য দামে বিভিন্ন জাতের ওষুধ ও ভ্যাকসিন’এর সুবিধা পাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ওই সব দেশের সরকার মানুষের কাছে যে অপেক্ষাকৃত ব্যয় সাশ্রয়ী  স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে পারছে, তাতে ভারতের এই ভূমিকা বিশেষ অবদান যোগাচ্ছে।

এই NAM ভার্চুয়াল শিখর সম্মেলনের আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল কোভিড-১৯ সংক্রমণের মোকাবিলায় বিশ্ব স্তরীয় সংহতির আহ্বান সহ একটি ঘোষণপত্র। এই অভাবনীয় বিশ্ব পরিস্থিতিতে NAM দেশগুলির চাহিদা ও প্রয়োজনগুলি চিহ্নিত কোরতে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন ও সুনির্দিষ্ট কর্ম পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ ছিল সম্মেলনের অপর বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয়।

উল্লেখ করা যেতে পারে, বিশ্ব স্তরে করোনা সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়েই গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সার্ক দেশগুলির নেতৃবর্গের মধ্যে আলোচনার যে উদ্যোগ নেন, NAM  সংযোগ গোষ্ঠীর শিখর সম্মেলন আয়োজনের ধারণা তা থেকেই যে অনুপ্রেরণা লাভ করে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। শুধু এই সম্মেলনই নয়, জি-২০ দেশ গোষ্ঠীর শিখর সম্মেলনের আয়োজনও সার্ক দেশগুলির নেতৃবর্গের মধ্যে আলোচনায় প্রেরণা পেয়েছিল।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিও এক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এ বছর এই নতুন পরিস্থিতিতে আরও বেশ কয়েকটি শিখর সম্মেলন অনলাইনে আয়োজন করা হতে পারে, যেমন ব্রিক্স সম্মেলন, NPT সুবর্ণজয়ন্তী সম্মেলন, ২০২০’র রাষ্ট্রসংঘ জলবায়ূ পরিবর্তন সম্মেলন, ও আগামী সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ সভার বার্ষিক অধিবেশন। এই পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলন,সরকারী পর্যায়ে ভার্চুয়াল সফর  সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।  এক কথায়, এই অতিমারি যখন শেষ হবে, তখন এমন এক বিশ্ব ব্যবস্থা জন্ম নেবে যা আমরা কেওই কখনও কল্পনা কোরতে পারি নি।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠাগুলিকে সময়ের দাবি মেনে নিজেদের নতুন ধাঁচে ঢালতে হবে। এটা কোরতে বিফল হলে  এগুলি জ্বলজ্যান্ত ফোসিল হয়ে থাকবে ও বিশ্ব ইতিহাসে ফুটনোট হিসেবে নিজেদের স্থান করে নেবে। NAM প্রতিষ্ঠানটিকেও সময়ের দাবি  অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ঘটাতে হবে।  নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলার উপযুক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে এর নতুন নতুন সুযোগ গ্রহণ কোরতে এর কাজকর্মে সংস্কার সাধন কোরতে হবে।

ইতিহাস অনেক সময়েই সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে তাল রাখতে পারে না। সে  কখনও এগিয়ে যায়, আবার কখনও পিছিয়ে পড়ে। মার্কিন  মানবতাবাদী  কবি ওয়াল্ট হোয়াইটম্যানের ভাষায় “ আমি বিশাল, তাই আমি বহুকে ধারণ করে আছি”। NAM’এর ক্ষেত্রেও এই একই বিশেষণ প্রযোজ্য। এর মূল আদর্শ এখনও অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও প্রাসঙ্গিক। সকলকে কাছে নিয়ে,এক সঙ্গে পথ চলাই এর মূলমন্ত্র। ( মূল রচনাঃ- ডঃ আশ নারায়ণ রায়)