কোভিড-১৯ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ

For Sharing

সমগ্র বিশ্ব এখন কোভিড-১৯ মহামারির তাণ্ডবের মোকাবিলায় বলতে গেলে দিশেহারা। সমগ্র মানব সভ্যতা এক চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে।  এই মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিটি দেশ তাদের যথাসম্ভব সহায় সম্পদ প্রয়োগের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে এর মোকাবিলায় এগিয়ে আসছে, এর থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায় খুঁজতে চাইছে। তবে যে কোনও সমস্যা যত বেশি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, তা নতুন নতুন সুযোগ  সৃষ্ঠিরও পথনির্দেশ দেয়। বিশ্বের ইতিহাসে যুগে যুগে এই ধরণের অজস্র উদাহরণ রয়েছে। বর্তমানে কোভিড-১৯ অতিমারির ক্ষেত্রেও এই একই প্রাকৃতিক নিয়ম প্রযোজ্য। এই  নতুন পরিস্থিতিতে  কোভিড-১৯’এর মোকাবিলায়  ভারত-প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে  সহযোগিতা বৃদ্ধি্র এক অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একেই ইংরাজীতে বলা হয় “নিউ নর্মাল”। কেবল ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলই বা কেন, সার্ক দেশগুলির মধ্যে এই মহামারির মোকাবিলায় সহযোগিতার প্রয়াসও এর উদাহরণ। এই মুহূর্তে বিশ্বে বিভিন্ন নামের দেশগষ্ঠী তা সে সার্ক হোক, ব্রিক্স হোক, ইউরোপীয় সঙ্ঘ হোক বা জি-২০ দেশগোষ্ঠী হোক- সব দেশগোষ্ঠীর মধ্যে এই নতুন পরিস্থিতিতে সদস্য দেশগুলির মধ্যে সংঘবদ্ধ প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত মার্চ মাসে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে করোনা মহামারির মোকাবিলায় সার্ক গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন একটি যৌথ নীতি কৌশল গ্রহণের উদ্দেশ্যে।

এই সমগ্র ঘটনাক্রমের প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯’এর মোকাবিলায় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার প্রয়াস কিছু অস্বাভাবিক নয়। আমাদের অনুধাবন কোরতে হবে এই মহামারির মোকাবিলায় এই সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই সংক্রমণ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এনেছে, যে কোনও বিশেষ দেশ বা বিশেষ সীমা মানে না ;যার তাণ্ডব সর্বব্যাপী। এটা  কেবল কোনো দেশ বিশেষের ক্ষেত্রেই  নয়,সমগ্র মানব জাতির সামনেই এক চরম বিপর্যয়ের বার্তা দিচ্ছে। করোনা মহামারী এখন প্রতিটি দেশগোষ্ঠীকে দ্বিমুখী নীতিকৌশল গ্রহণে বাধ্য করছে। এক দিকে জন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নীতিকৌশল রচনা, অন্যদিকে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।

এই পরিস্থিতিতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির বিদেশ সচিবদের  সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলার  আলাপ আলোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। করোনা মোকাবিলায় প্রতিটি দেশের গৃহীত সর্বোত্তম স্বাস্থ্য পরিষেবা ও এই মহামারির বিষয়ে তথ্য আদানপ্রদানের উদ্দেশ্যে  ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ভুক্ত  অস্ট্রেলিয়া , জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিদেশ সচিবদের সঙ্গে  শ্রী শ্রীংলার টেলিফোনে সাপ্তাহিক আলোচনা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। ভূ- রাজনৈতিক দিক থেকে দেশগুলির অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড; পূর্ব এশিয়ার জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া;আসিয়ান ভুক্ত ভিয়েতনাম ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। করোনা অতিমারির মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া, নিউ জিল্যান্ড ও ভিয়েতনাম প্রাথমিক পর্যায়েই এই অতিমারি নিয়ন্ত্রণে বেশ সাফল্য পেয়েছে। যেখানে তিনটি বিষয়, যেমন টেস্টিং, কোয়ারেন্টিন ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং’এর ওপর জোর দেওয়া হয়।  এর সঙ্গে মানুষের গতিবিধির ওপরেও বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়।

আলাপ আলোচনা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে ওষুধপত্র, অন্য চিকিৎসা উপকরণ ও খাদ্য দ্রব্যের ধারাবাহিক সরবরাহের সমস্যাটিরও সমাধানের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা বন্ধ থাকায় বিভিন্ন দেশে আটকে পড়া ভিন দেশের মানুষদের সমস্যা সমাধানে দেশগুলির মধ্যে দূতাবাস পর্যায়ে নিয়মিত তথ্য আদান প্রদান করা হচ্ছে। অতিমারির মোকাবিলায় বহু পাক্ষিক স্তরে অর্থের সংস্থানের বিষয়টির ক্ষেত্রেও আলাপ আলোচনা প্রক্রিয়া বিশেষ জরুরি। সদস্য দেশগুলি সে দিকেও নজর দিচ্ছে। করোনা সংক্রমণ ছাড়াও বিশ্ব অর্থব্যবস্থা যে মারাত্মক মন্দা পরিস্থিতির সম্মুখীন, তার মোকাবিলায় একটি যৌথ তহবিল গঠন অত্যন্ত জরুরি। দেশগুলি সে বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছে।

কোভিড-১৯ প্যান্ডেমিক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে।  চীন প্রচ্ছন্নভাবে তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ‘চাইনিজ হেলথ সিল্ক রোড’এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ছোট ছোট দেশগুলিকে সাহায্যের চেষ্টা বাড়িয়েছে। ভারতও তার নৌ কূটনীতির মাধ্যমে মালদ্বীপ, মরিশাস, সিসিলি ও কমরোজ’এর মত  ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এই সব অঞ্চলে কোভিড-১৯ প্যানডেমিকের মোকাবিলায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, কোভিড-১৯ অতিমারি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার আদর্শের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। (মূল রচনাঃ- শঙ্করী সুন্দররমণ)