নেপালের কালাপানি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি

For Sharing

ভারতের উত্তরাখন্ডের পিথোরাগড় জেলা এবং নেপালের পশ্চিমাঞ্চলের ধরচূড়া জেলায় ভারত, নেপাল ও চীনের সংযোগস্থলে কালাপানি অঞ্চল নিয়ে নেপাল  আগেও আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন করেছে। গত ২০শে মে নেপালের কমিউনিস্ট সরকার প্রকাশিত একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মানচিত্র নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির নেতৃত্বে নেপালের ক্যাবিনেট ঐ মানচিত্রটি অনুমোদন করে। এতে কালাপানি, লিমপিয়াধুরা ও লিপুলেখ এলাকাকে নেপালের অঞ্চল বলে দেখানো হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ অঞ্চল কেন্দ্রীয় অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পর ২০১৯এর ২রা নভেম্বর নতুন দিল্লি প্রকাশিত মানচিত্র অনুযায়ী ঐ অঞ্চলগুলি সার্বভৌম ভারতের অন্তর্ভূক্ত অঞ্চল।

ভারত ও নেপাল ঘনিষ্ট প্রতিবেশী দুটি দেশ যাদের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে। হিমালয় অঞ্চলের কালাপানি থেকে নির্গত কালি নদীর নিকটবর্তী একটি ক্ষুদ্র কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐ অঞ্চল নিয়ে নেপালের দাবি উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে। এর সূচনা ১৮১৬ সালে স্বাক্ষরিত সেগাউলি চুক্তির থেকে। ১৮১৫’র ২রা ডিসেম্বর নেপালের রাজা ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐ চুক্তির ৫নং অনুচ্ছেদ অনুসারে কালি নদীর পশ্চিম পারের সমস্ত অঞ্চল ভারতের এবং পূর্বদিকের সমস্ত অঞ্চল নেপালের অন্তর্ভূক্ত। এর ফলে ভারত-নেপাল-চীন এই তিন দেশের সংযোগস্থলে কালি নদী ভারত ও নেপালের মধ্যবর্তী সীমান্ত হয়ে ওঠে। পরে টনকপুর ব্যারেজ ও পঞ্চেশ্বর বিদ্যুত প্রকল্প গড়ে তোলার জন্য ভারত ও নেপালের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি মহাকালী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর সূচনায় মহাকালী নদীকে দুটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যবর্তী সীমানা বলে চিহ্নিত করা হয়।

কমিউনিস্টদের সমর্থনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তৎকালীন নেপালি কংগ্রেস সরকারের আমলে এই চুক্তিটি অনুমোদিত হয়।

ভারতের সীমানার ভিতর কোনো বিতর্কিত অঞ্চল নেই। ভারতীয় রাষ্ট্র এবং কেন্দ্রীয় সরকার এই অঞ্চল থেকে নিয়মিতভাবে ভূমি রাজস্ব এবং অন্যান্য কর নিয়ে থাকে এবং এই ত্রিদেশীয় সীমানার সংযোগস্থল ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রহরাধীন। নভেম্বর ২০১৯’এ ভারতের প্রকাশিত মানচিত্রটি নিয়ে নেপাল আপত্তি জানায়। ভারত সরকারিভাবে ব্যাখ্যা দেয় যে, মানচিত্রটি ভারতের সার্বভৌম অঞ্চলের সম্পূর্ণ সঠিক বর্ণনা করেছে। নতুন মানচিত্র কোনোভাবেই নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমানা পরিবর্তন করে নি। তবে নেপালের সংসদে এই বিষয়টি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে এবং বন্ধুত্বপূর্ণভাবে মিটিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। দুটি দেশই পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে আলোচনার বিষয়ে একমত হয় যদিও তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয় নি।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এই মাসের ৮ তারিখে লিপুলেখের সঙ্গে উত্তরাখন্ডের পিথোরাগড় জেলার ধরচুরা শহরের সংযোগ স্থাপনকারী ৮০ কিলোমিটারব্যাপী সড়কের উদ্বোধন করেছেন। ব্যবসাবাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি এবং স্বশাসিত তিব্বতের কৈলাশ মান সরোবরে তীর্থযাত্রা আরো সহজ করার জন্য এই সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে নেপাল সংসদে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলগুলি তথা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। নেপাল নতুন দিল্লির কাছে কূটনৈতিক স্তরেও বিষয়টি উত্থাপন করেছে। ভারত কোভিড – ১৯ অতিমারীর সংকট কেটে যাওয়ার পর এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে। দুটি দেশই এখন এই অতিমারীতে আক্রান্ত। এই সংকটের প্রেক্ষিতে ভারত ইতিমধ্যেই নেপালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং চিকিৎসক দল ছাড়াও অন্যান্য সাহায্য পাঠিয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি নেপালের সংসদে বলেছেন লিমপিয়াধুরা, কালাপানি এবং লিপুলেখ নেপালের অঙ্গ এবং যেকোনো মূল্যে সেগুলো ফেরত নিতে তারা বদ্ধপরিকর। তিনি আরো জানান যে, এই বিষয়ে তাঁর সরকার চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে।

 

ভারত নেপালের এই অভিযোগ খন্ডন করেছে এবং স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, নেপালের প্রকাশিত মানচিত্রটির ঐতিহাসিক তথ্য এবং প্রমাণ নির্ভর নয়। এই ধরণের কৃত্রিম বিস্তারের দাবি নতুন দিল্লির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

শ্রী ওলি  নেপালে কোভিড-১৯ -এর বিস্তারের জন্যও ভারতকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন যে, চীন বা ইটালি থেকে আসা লোকেদের থেকেও ভারত থেকে ফেরত আসা লোকেদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি। এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় এবং একই সঙ্গে ভিত্তিহীন। যদিও নেপালের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ভারতের পক্ষে হাল্কাভাবে নেওয়া অসম্ভব কারণ এই বক্তব্য চীনের প্রতি তাঁর ঝুঁকে থাকার দিকে ইঙ্গিত করে। এই বক্তব্য নেপালে অতি জাতীয়তাবাদী আবেগকে বাড়ানোরও একটা প্রয়াস। এই বক্তব্য শ্রী ওলির নিজের দল নেপাল কম্যুনিস্ট পার্টির আভ্যন্তরীণ হুমকির থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটা চেষ্টাও হতে পারে। ভারতের এই ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তবে দুভারও ও নেপালের মধ্যে শতাব্দী প্রাচীন সম্পর্কের প্রেক্ষিতে বলা যায়, এই দুই দেশকে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যার সমাধানের প্রয়াস নিতে  হবে।

(মূল রচনাঃ রত্তন সালদি)