রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের আসনে ভারত জয়ী

For Sharing

ভারত রাষ্ট্রসঙ্ঘের  অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৪৫সালের ২৬শে জুন সানফ্রান্সিস্কো সম্মেলনে ভারত রাষ্ট্রসংঘ সনদে স্বাক্ষর করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ সনদ পাঁচ জন অনির্বাচিত স্থায়ী সদস্য ( চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েট ইউনিয়ন) এবং দশজন নির্বাচিত সদস্য নিয়ে রাষ্ট্র সংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইউ এন এস সি সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য নির্বাচিত সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ দু বছর। রাষ্ট্রসংঘ সনদ অনুযায়ী ইউ এন এস সির প্রাথমিক দায়িত্ব হল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।

ভারত ১৯৪৭এর আগস্টে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫০-৫১ সালে রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি শূন্য পদে নির্বাচিত হয়। তখন থেকে, ভারত সাতবার দুবছরের কার্যকালের মেয়াদের জন্য নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচিত হয়েছে। গড়ে প্রতি দশকে একটি করে কার্যকালের মেয়াদ। তাদের নিরাপত্তা পরিষদের গত কার্যকালের মেয়াদ শেষ হয় ২০১২র ডিসেম্বরে।

২০১৩র নভেম্বরে ভারতের প্রার্থীপদের কথা আফগানিস্তান ইস্লামিক সাধারণতন্ত্র এবং ভারতের পক্ষ থেকে এক যৌথ ইস্তাহারে ইউ এন জি একে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ২০২১-২০২২ এর জন্য আফগানিস্তান ভারতের পক্ষে তাদের প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই শূন্য আসনের জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘ সাধারণ সভায় ১৭ই জুন ২০২০ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৪ সদস্যের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গোষ্ঠী থেকে ভারতই একমাত্র অনুমোদিত প্রার্থী ছিল। ভারত ইন্দোনেশিয়ার স্থলাভিষিক্ত হবে। ভারত দুই তৃতীয়াংশ ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। মোট ১৯৩টির মধ্যে ভারত ১৮৪টি ভোট পেয়েছে।

কোভিড ১৯ অতিমারীর ফলে শারীরিক দূরত্বের নিয়ম পালন করে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট হয়। এই প্রথম রাষ্ট্রসঙ্ঘ সাধারণ সভা ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের পূর্নাঙ্গ অধিবেশন ডাকে নি। বিশেষভাবে মনোনীত একজন প্রতিনিধি প্রতিটি প্রতিনিধি দলের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা ইউ এন জি এ প্রেক্ষগৃহে  নির্ধারিত সময়ে তাদের ভোট প্রদান করে।

২০২১শের পয়লা জানুয়ারী শুরু হওয়া দু বছরের এই কার্যকালে ভারতের অগ্রাধিকার ৫ই জুন ২০২০ তারিখে নতুন দিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শংকর প্রকাশ করেন। ভারতের লক্ষ্য হবে সংস্কার কৃত বহু পাক্ষিক এই  ব্যবস্থার নতুন ওরিয়েন্টেশন (NORMS), আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার সামনে বিভিন্ন জটিল চ্যালেঞ্জের জবাব দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রসংঘ এবং সংস্কার কৃত নিরাপত্তা পরিষদকে যোগ্য করে তোলা খুবই প্রয়োজনীয়।

এই ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ফলপ্রসু ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে উপযুক্ত ভাবে গড়ে তোলার প্রতি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।  তাছাড়া ফাইনান্সিয়াল এ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফ এ টি ই)এর মত সংস্থার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের সামঞ্জস্য বিধান করে চলাও একান্ত জরুরী।

নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে ভারতের লক্ষ্য হল ১৩টি সক্রিয় রাষ্ট্রসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের অধিক স্বচ্ছতা, দিশা নির্দেশ এবং পেশাদারিত্ব সুনিশ্চিত করা।  বর্তমানে মহিলা শান্তিরক্ষী সহ ভারতের প্রায় ৬০০০ সৈনিক রয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ শান্তি রক্ষা মিশনে। প্রধানত এই শান্তিরক্ষীরা দক্ষিণ সুদান কঙ্গো ও লেবাননে মোতায়েন রয়েছে।

তৃতীয় অগ্রাধিকার হল মানবতার স্পর্শ সহকারে প্রযুক্তির প্রয়োগ। ভারত চিরাচরিতভাবে আলোচনার নীতিতে বিশ্বাস করে  এবং আন্তর্জাতিক আইন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতি তার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের ফলে যখন পরিষদের কার্যকারিতা প্রভাবিত তখন নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের নির্বাচন হল। এই মেরুকরণের ফলে কোভিড ১৯ এর প্রতি আন্তর্জাতিক প্রয়াসের রাজনৈতিক সমর্থন সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহনে ইতিমধ্যেই প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য পরিষদের চ্যালেঞ্জকে আরো কঠিন করে তুলেছে।

ভারত ২০২২ সালে জি ২০র পৌরহিত্য করবে। তখন তারা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য থাকবে। এর ফলে ভারতের পক্ষে নেতৃত্বের এক অপার সুযোগ আসবে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে এক অভিন্ন যোগসূত্র গড়ে তোলার যেখানে পরিষদ সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আশা করা যায়। (মূল রচনাঃ অশোক কুমার মুখার্জী)