RIC বিদেশ মন্ত্রীদের বৈঠক

For Sharing

রাশিয়া-ভারত-চীন – সংক্ষেপে RIC’র বিদেশ মন্ত্রীদের সপ্তদশ বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। রাশিয়া বৈঠকের পৌরহিত্য করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজিবাদের বিরুদ্ধে জয়লাভের ৭৫তম বিজয় দিবস উদযাপনের লক্ষ্যে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে এছাড়াও কোভিড – ১৯ সংকটের মোকাবিলার পন্থাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়।

দিল্লি ও পেইচিং’এর মধ্যে সীমান্ত প্রশ্নে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেই ভিডিও মাধ্যমে এই বৈঠক হল। প্রত্যাশিতভাবেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শংকর স্পষ্টভাবে এই বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান জ্ঞাপন, সহযোগীদের বিধিসম্মত স্বার্থের দিকগুলিকে স্বীকৃতিদান, বহুপাক্ষিকতাকে সমর্থন এবং সার্বজনীন সুফলের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। RIC’র মূল লক্ষ্যগুলি এর মধ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ত্রিদেশীয় গোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের প্রেক্ষিতে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তার মধ্যেও এই বৈঠক অংশগ্রহণকারীদের অভিন্ন আগ্রহগুলি অন্বেষণের আকাঙ্খাকে তুলে ধরে। উল্লেখযোগ্য, রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাবার্তায়, চলতি বছরের শেষ দিকে RIC বিদেশ মন্ত্রীদের বৈঠকের আয়োজন করার কথা জানিয়ে RIC আলোচনাকে আরো প্রসারিত করার বিষয়ে তাঁদের ঐকমত্যের ওপর আলোকপাত করেন।

ভিডিও মাধ্যমে RIC বিদেশ মন্ত্রীদের ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের ভাষণে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর বলেন, টোবরুক, এল আলামেইন এবং মন্টেকাসিনো থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর, কোহিমা ও বোর্নিও পর্যন্ত বিশ্বের বহু যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় রক্ত ঝরেছে। ভারতীয় সেনানিরা অর্ডার অব দ্য রেড স্টারে সম্মানিত হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ডঃ কোটনিস ও তাঁর মেডিক্যাল মিশন চীনে কিংবদন্তী হয়ে  আছে। সুতরাং ভারতীয় সামরিক বাহিনী যখন রেড স্কোয়ারে কুচকাওয়াজ করবে  তা হবে তাদের সেই স্বতন্ত্র্য ভূমিকারই স্বীকৃতি।

২০০২ সালে তৎকালীন রুশ বিদেশ মন্ত্রী ইয়েভজেনি প্রিমাকোভের উদ্যোগে RIC আত্মপ্রকাশ করে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে রাশিয়া, ভারত ও চীন,  তাদের আশা আকাঙ্খাকে প্রতিফলিত করে এমন একটি বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিল।

গত দুই দশকেও বেশী সময় ধরে RIC এর সদস্য দেশগুলিকে কৌশলগত আদানপ্রাদানের মঞ্চ প্রদান করেছে। ২০১৭’য় ডোকলাম সংকট এবং ২০১৯’এর ফেব্রুয়ারিতে বালাকোট বিমান হামলার সময় এটি বিশেষভাবে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছিল। এই তিনটি দেশের মধ্যে আস্থা বর্ধক পদক্ষেপের ফলস্বরূপ ২০১৮’র বৈঠক হয়।

তবে গত কয়েক বছরে অনেক জল বয়ে গেছে। আরআইসি সদস্য দেশগুলির দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিভেদ বৃহৎ শক্তির বহুবিধ ক্ষমতার দ্বন্দের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে।

ভারত ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো মজবুত করেছে। এর পাশাপাশি ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কে উত্তেজনা এবং রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান আঁতাতের সমান্তরালভাবে চলেছে। এর ফলে ভারতের ঐতিহ্যগত সহযোগী রাশিয়া ভারতের কৌশলগত স্বার্থে ব্যাঘাতকারী বহু বিষয়ে নিজেদের অবস্থান বার বার পুণর্নির্ধারণ করেছে।

তবে এসব সত্বেও সদস্য দেশগুলির অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ অন্বেষণ, অবস্থান স্পষ্ট করা অথবা মতপার্থক্যগুলি খতিয়ে দেখার একটি মঞ্চ হিসেবে এর গুরুত্ব রয়েছে। এছাড়াও ইউরেশিয়ার বিষয়ে ভারতের অবস্থান মজবুত করার ক্ষেত্রে উদীয়মান ইউরেশিয় শক্তি হিসেবে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সমুদ্র ক্ষেত্র নয়, ভারতের আগ্রহ আরো বেশী বহু দিকে প্রসারিত। এর জন্য ভারতের কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য আরো মজবুত করতে রাশিয়া ও চীনের আগ্রহ, অন্যদিকে চীনের আধিপত্যের মোকাবিলায় ভারত ও রাশিয়ার স্বার্থের দিক থেকেও এটি তাৎপর্যপূর্ণ।

এমন একটা সময় যখন কোভিড – ১৯ অতিমারি বিশ্বায়নের গতি স্তব্ধ করছে, বহুত্ববাদকে হ্রাস করেছে, স্বাস্থ্য পরিষেবা ধ্বংস এবং বিশ্ব মন্দার প্রান্তে, এই অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একে অপরের শক্তিকে একত্রিত করলে এই সমস্ত নতুন ধরণের চ্যালেঞ্জের আরো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যাবে। এই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান থেকে উদ্ভূত সন্ত্রাসবাদ সমগ্র ইউরেশিয় অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব এই তিনটি সদস্য দেশের ওপরেই পড়বে।

(মূল রচনাঃ রাজর্ষি রায়)