নেপালকে তার সাম্প্রতিক আচরণ সংশোধন কোরতে হবে

For Sharing

নেপাল ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক দিক থেকে বহুমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান। এমনকি দুটি দেশের জনগণের প্রাত্যহিক জীবন যাত্রা এই সম্পর্কের ভিত্তিতেই আবর্তিত হয়, যার প্রমাণ বিশ্বের অন্য কোনও দেশের ক্ষেত্রেই নেই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সম্প্রতি নেপালের রাজনীতিতে এমন এক জাতিয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, যা ঘোর ভারত বিরোধী। আর এই ধরণের সংকীর্ণ রাজনীতি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভারত-নেপাল সম্পর্কে এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। অথচ গভিরভাবে খতিয়ে দেখলে এর কোনো সংগত কারণই খুঁজে পাওয়া যায় না।

গত সপ্তাহে নেপাল তার সংবিধান সংশোধন করে সে দেশের মানচিত্রে এমন কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত করল, যা ঐতিহাসিক দিক থেকে ভারতের একান্ত নিজস্ব অঞ্চল। যেমন ভারত-চীন সীমান্তের কাছে উত্তরাখন্ডের কালাপানি, লিপুলেখ ও লিমপিয়াধুরা অঞ্চল। কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা পথের অঙ্গ হল ভারতের এই সব এলাকা। শুধু তাই নয় নেপালের জাতীয় চিহ্নে এই নতুন মানচিত্রের একটি বহিঃ সীমানা দেখানো হয়েছে। আর এটা করা হয়েছে সম্পূর্ণ একতরফা ভাবেই, যা যে কোনো পরিস্থিতিতেই এড়ানো যেত।

কেবল মানচিত্র সংশোধনই নয়, নেপাল নাকি তার নাগরিকত্ব আইনও সংশোধন কোরতে উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশী মেয়ে নেপালের নাগরিককে বিবাহ করলে সে সে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ কোরতে পারে। এই প্রথা বিশেষ করে দুটি দেশের সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী  দম্পতির ক্ষেত্রে বিশেষ লাভদায়ী প্রমাণিত হয়েছে, যাকে বলা হয় রোটি-বেটি সম্পর্ক যা দু দেশের মধ্যে জনসম্পর্কের এক গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। এখন এই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে বিবাহের সাত বছর পরেই সেই মহিলা নেপালের নাগরিকত্ব পাবার প্রক্রিয়া শুরু কোরতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পার্টী নেপাল কমিউনিসট পার্টী্র সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই আইন এখন সহজেই পাশ করানো সম্ভব হবে বলেই অনুমান। আশংকা করা হচ্ছে, এই নতুন আইন সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলির মধ্যে বন্ধন শিথিল করবে; আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মদেশি জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলির। এ ছাড়াও এই আইন নেপালের সংবিধানে উল্লেখ করা লিঙ্গ সমতার আদর্শেরও পরিপন্থী। সংক্ষেপে নতুন মানচিত্র সংক্রান্ত আইন ও নতুন নাগরিকত্ব আইন দুটি দেশের পরস্পরের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে যুগপ্রাচীন সম্পর্কে নিঃসন্দেহে অন্তরায় সৃষ্টি করবে।

নেপাল বর্তমানে কোভিড-১৯ সংক্রমণ জনিত এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের  মুখোমুখি।   এই দেশকে একাধিক সমস্যার এক যোগে মোকাবিলা কোরতে হচ্ছে। চিকিৎসা পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে,  বিদেশে কর্মরত নেপালি নাগরিকদের অর্থ পাঠানো প্রায় বন্ধ। বিদেশ থেকে কাজ হারিয়ে হাজার হাজার নেপালী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থব্যবস্থা চরম সংকটের মুখে। এর ওপর আছে ত্রুটিপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সর্বস্তরে দুর্নীতির প্রতিবাদে ব্যাপক জনরোষ।

নেপালের এই সংকট সময়ে ভারত বিরোধী জাতিয়তাবাদে  সরকারী প্রশ্রয় দেশের সামগ্রিক স্বার্থে কতটা বা আদৌ লাভদায়ী হবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহের অবকাশ থেকে গেছে।

ভারতের প্রতি নেপালের এই নেতিবাচক আচরণ সত্বেও ও লক ডাউনের সময়েও দুটি দেশের মধ্যে  বাণিজ্য মোটা মুটি একই রকম রয়েছে। করোনা অতিমারির মোকাবিলায় ভারত নেপালকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ পাঠাচ্ছে। এ ছাড়াও দুটি দেশ নেপালের পশুপতিনাথ মন্দির পরিসরের পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার উন্নতিসাধনের জন্য একটি সমঝোতা স্মারকপত্র- মৌ স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়াও যৌথ সহযোগিতায় নেপালের জল বিদ্যুৎ প্রকল্প উন্নয়নে ভারতের জাতীয় জল বিদ্যুৎ নিগম ও নেপালের জলশক্তি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন নিগম আর একটি মৌ স্বাক্ষর করেছে।

নেপালী কর্তৃপক্ষকে এখন অনুধাবন কোরতে হবে, সংকীর্ণ রাজনীতি দূরে সরিয়ে রেখে দুটি দেশের জনগণেরই স্বার্থে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য , বিনিয়োগ, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর এর মধ্যেই সে দেশের মঙ্গল নিহিত আছে।  (মূল রচনাঃ- মনজিব সিং পুরি)