প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর রাশিয়া সফর

For Sharing

সমগ্র বিশ্ব কোভিড – ১৯ অতিমারির সঙ্গে যুঝছে; সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং’এর রাশিয়া সফর, শুধুমাত্র ভারতের জন্যই নয়, রাশিয়া ও চীনের জন্যও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিন দিনের ঐ সফরে শ্রী সিং রাশিয়ার শীর্ষ সামরিক পদাধিকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েতের জয়লাভের ৭৫তম বার্ষিকীতে মস্কোয় আয়োজিত বিশেষ সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধুমাত্র রাশিয়া বা অন্যান্য দেশের সেনানিদের আত্মবলিদানই নয়, ভারতীয় সেনানিদের তাৎপর্যপূর্ণ অংশগ্রহণের প্রেক্ষিতে বিজয় দিবসে ভারতের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত প্রশ্নে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই সফরে গেলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৫ সদস্যের একটি দল কুচকাওয়াজে অংশ নেয়; চীনও এই কুচকাওয়াজে যোগ দেয়। এই সফর ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে থাকা বিশেষ এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক সম্পর্কেরও পরিচায়ক।

রাশিয়া, ভারত ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করছে। রাশিয়া-ভারত-চীন গোষ্ঠী – RIC  তথা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন – SCO এবং BRICSর মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক দেশগোষ্ঠীর জন্যও তা বিশেষভাবে জরুরি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং, এই সফরে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং অন্যান্য শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বিস্তারিত বৈঠক করেন। নতুন দিল্লির সামনে ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার প্রেক্ষিতে, দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সমঝোতা অনুসারে,  ভারত অবিলম্বে রাশিয়ার তৈরি এস- ৪০০ ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা অথবা ট্যাঙ্ক, লড়াকু বিমান ও হেলিকপ্টারের মতো সাজসরঞ্জাম আমদানিতে আগ্রহী। শ্রী সিং জলপথের পরিবর্তে আকাশপথে এই সমস্ত সরবরাহের কথা বলেছেন। এর ফলে দূরত্ব এবং সময় – দুইই  কম হবে বলে তিনি জানান। রাশিয়া এ বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

রাশিয়া এর আগেও তুরস্ককে এই ধরণের সাজসরঞ্জাম আকাশপথে সরবরাহ করেছে। সুতরাং ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার কৌশলগত বিশেষ অংশীদারিত্বের প্রেক্ষিতে ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা বা অন্যান্য কৌশলগত সামরিক সাজসরঞ্জাম সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। উল্লেখ্য, বর্তমানে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা চুক্তির আর্থিক পরিমাণ সাড়ে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে এই পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কোভিড – ১৯ পরিস্থিতির ছায়া, ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরো জোরদার করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভীর আগ্রহের প্রেক্ষাপটে মস্কো, ভারতের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা বাণিজ্য কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে দিতে চায় না।

রাশিয়ার দুই কৌশলগত সহযোগী – ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং’এর রাশিয়া সফর থেকে অনুমান করা হচ্ছিল যে ভারত রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে বাস্তবে তা হয় নি। ভারত ও রাশিয়া বিশেষ কৌশলগত অংশীদার হলেও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই চলে থাকে। নতুন দিল্লি পররাষ্ট্র সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের সহায়তা নেয় নি।

তবে রাশিয়াও তার দুই কৌশলগত সহযোগী দেশের মধ্যে এই উত্তেজনা বৃদ্ধি চায় না। মস্কো RIC ফরম্যাটের আওতায় একটি ত্রিদেশীয় বৈঠক করেছে। রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, RIC’কে আরো মজবুত করতে হবে। ভারতও ঐ ভার্চুয়াল বৈঠকে তাদের মনোভাব ব্যক্ত করেছে।

কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতিতে, ভারত ও চীন উভয়েরই কৌশলগত সহযোগী  হিসেবে রাশিয়ার কাছে এই উত্তেজনার প্রশমন গুরুত্বপূর্ণ। SCO এবং BRIC’এর সঙ্গে RIC বিশেষভাবে যুক্ত। রাশিয়ার কাছে ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন যাতে অন্য কোনো দেশ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে। একটি বহুপাক্ষিক বিশ্ব গড়তে আগ্রহী মস্কো, পশ্চিমী দেশগুলিকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিতে চায় না।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং’এর এই সফর ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বিশেষ সম্পর্ককেই আরো একবার তুলে ধরেছে। এই বিশেষ দ্বিপাক্ষিক  সম্পর্ককে আরো মজবুত করতে ভারতকে প্রতিরক্ষা সাজসরঞ্জাম সরবরাহ, রাশিয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

(মূল রচনা – ডঃ ইন্দ্রাণি তালুকদার)