পাকিস্তান আবার নিজের জালেই জড়িয়ে পড়ল

For Sharing

আজকাল পাকিস্তানের সময়টা ভাল যাচ্ছে না। দেশটি এখন দুটি বিপদের একযোগে মোকাবিলা কোরতে গিয়ে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছে;  একদিকে কোভিড-১৯ অতিমারির মোকাবিলা; অন্যদিকে দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে সামাল দেবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। এর ওপর আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে প্রশ্রয় দেবার দায়ে সারা বিশ্বে একঘরে অবস্থা।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। কয়েকদিন আগেই  মার্কিন বিদেশ দপ্তর এক রিপোর্টে পাকিস্তানকে লস্কর-এ তৈবা ও জয়েশ-এ মুহম্মদের মত বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় স্থল ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে উস্কানি দেওয়া সহ সন্ত্রাসবাদ দমনে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আনল। আর পাকিস্তানী নেতৃবর্গ, এই অভিযোগ খণ্ডন কোরতে গিয়ে আরও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল। উল্লেখ করা যেতে পারে, জম্মু ও কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে যে সব জঙ্গি মারা পড়েছে, তাদের ইমরান সরকার নিরীহ মানুষ বলে মন্তব্য করার এক দিন পর গত বুধবার মার্কিন বিদেশ দপ্তর সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে ইসলামাবাদকে ভর্ৎসনা করল।

পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গত বৃহস্পতিবার ন্যাশানাল অ্যাসেম্বলিতে তাঁর ভাষণে ৯/১১’র মূল চক্রী ও আল কায়দা জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে ‘শহিদ’ আখ্যা দিলেন। তিনি এখানেই থেমে থাকলেন না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমেরিকার সহযোগী হবার জন্য অনুতাপ ব্যক্ত করলেন।  ওয়াশিংটন, ইসলামাবাদকে কিছু না জানিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে ঢুকে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে উচিত কাজ করে নি বলে পাক প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করলেন। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমর্থন জানিয়ে উলটে তার দেশকেই বদনামের ভাগি হতে হচ্ছে বলে ইমরান খান সকল সদস্যকে জানালেন। তিনি আফগানিস্তানে মার্কিন ব্যর্থতার সরাসরি অভিযোগ আনলেন। তিনি আরও বললেন, সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে মার্কিন অভিযানে সত্তর হাজারের মত পাকিস্তানীকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

সন্ত্রাস  দমনের প্রশ্নে পাকিস্তানের এ পর্যন্ত ট্র্যাক রেকর্ড আদৌ সন্তোষ জনক নয় বলে মার্কিন বিদেশ বিভাগের প্রকাশিত রিপোর্টটি পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষকে আরও বিব্রত করে তুলল। এদিকে আবার সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তা নিরীক্ষণ কারী টাস্ক ফোর্স FATF, এ ব্যাপারে পাকিস্তানের ভূমিকায় আদৌ সন্তুষ্ট না হয়ে দেশটিকে আবার ধূসর তালিকাভুক্ত করল। এর আগে  FATF, করোনা অতিমারি জনিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পাকিস্তান যে সন্ত্রাসবাদে আর্থিক মদত দেয় না তার স্পষ্ট প্রমাণ দিতে  আরও চার মাস সময় দিয়েছিল। পাকিস্তান এখন আবার ধূসর তালিকাভুক্ত হওয়ায় ইমরান খান সরকারের  শুধু নিজের দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনেও প্রতিচ্ছিবি কলুষিত হল।

রিপোর্টে মার্কিন বিদেশ বিভাগ বলেছে, সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ও ভারতের বিরুদ্ধে পরিচালিত জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানের নেওয়া ব্যবস্থা একান্তই দায়সারা প্রমাণিত হয়েছে। জয়েশ-এ মুহম্মদ ২০১৯’এর ফেব্রুয়ারীতে পুলওয়ামা আত্মঘাতি বোমা হামলার দায় স্বীকার করায় ইমরান খান সরকারের অস্বস্তি আরও বেড়েছে।

রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে, পাকিস্তান কাল বিলম্ব না করে ও কোনো ভেদাভেদ না করে সব জঙ্গি সংগঠন ভেঙে দেবার যে প্রতিশ্রুতি  আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ২০১৫ সালে দিয়েছিল, তাও পূরণ করা হয় নি। পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ গত বছর ডিসেম্বরে লস্কর-এ তৈবা’র প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সঈদ ও তার ১২ জন সহযোগীকে ভর্ৎসনা করলেও ২০০৮’এর মুম্বাই জঙ্গি হানার মূল চক্রী জয়েস-এ মুহম্মদ প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ আজাহার ও সাজিদ মীর’কে আইনের কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে কোনো উদ্যোগই নেয় নি। ঘবরে প্রকাশ, এরা দুজনেই রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় বেশ ভালভাবেই রয়েছে, যদিও সরকার তা স্বীকার করছে না।

পুরো ঘটনাক্রম থেকে এটা এখন স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পাকিস্তান কখনই আন্তরিক নয়, এ ব্যাপারে দেশটি এখনও কোনো নির্ণায়ক ব্যবস্থা নেয় নি, কেবল কথাই দিয়েছে, কাজের কাজ কিছুই করে নি। আর সঙ্গত কারণেই ইসলামাবাদ সরকারকে এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে ক্রমাগত জবাবদিহি কোরতে হচ্ছে। ( মূল রচনাঃ- কৌশিক রায়)