ভারত-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদারিত্ব

For Sharing

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে বার্তালাপে রাশিয়ায় সংবিধান সংশোধনীর ওপর সাফল্যের সঙ্গে গণভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায়  অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই গণভোট নেওয়া হয় ২০২০’র ২৫’এ জুন থেকে পয়লা জুলাই পর্যন্ত সময়ে। জনগণ এই সংশোধনীর পক্ষে রায় দেওয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের এর পরেও ৬ বছরের দুটি মেয়াদে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন থাকার পথ সুগম হল। তা হলে তিনি ২০৩৬ সাল পর্যন্ত এই পদে থাকবেন। পুতিনের রাষ্ট্রপতি পদের বর্তমান মেয়াদ ২০২৪ সালে সম্পূর্ণ হচ্ছে। বিশ্ব নেতৃবর্গের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি হলেন প্রথম যিনি গণভোট সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ায় রুশ রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানালেন।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে রাশিয়ার বিজয়ের ৭৫ বর্ষপূর্তিতে গত জুন মাসের ২৪ তারিখে বিজয় দিবস উদযাপন কুচকাওয়াজে ভারতীয় সেনা দলের অংশগ্রহণকে দুটি দেশের গভীর বন্ধুত্বের নিদর্শন বলে শ্রী মোদি অভিহিত করলেন।

দুই নেতা, তাঁদের মধ্যে টেলিফোনে বার্তালাপে কোভিড-১৯ অতিমারি নিয়ন্ত্রণে গৃহীত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। এবং এই অতিমারি পরবর্তী বিশ্বে সম্ভাব্য সব চ্যালেঞ্জের একযোগে মোকাবিলার সংকল্প ব্যক্ত করলেন দুই নেতা। ২০২০’র শেষের দিকে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রুশ রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে শ্রী মোদি তাঁর আগ্রহের কথা জানিয়ে দেন।   আলোচনার সময় পুতিন সব ক্ষেত্রে দুটি দেশের মধ্যে বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বকে ক্রমাগত শক্তিশালী করার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন।

১৯৯১ সালে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে স্বাধীন রাশিয়ান ফেডারেশন’এর আত্মপ্রকাশের অনেক আগে ভারত ও সেই সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ১৯৭১ সালে  শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ’এর আত্মপ্রকাশের পথ প্রশস্ত করে।

১৯৯১ সালে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর ২০০০ সালে ভারত ও রাশিয়া কৌশলগত অংশিদারিত্ব চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যা ২০১০ সালে বিশেষ ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত কৌশলগত অংশিদারিত্ব পর্যায়ে উন্নীত হয়। ২০০০ সালে রুশ রাষ্ট্রপতি পুতিনের ভারত সফরের সময় তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রথম বার্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে রাশিয়া ও ভারতে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়ে আসছে। দুটি দেশ যে পারস্পরিক বন্ধুত্বের ওপর কত গুরুত্ব দেয়, এই বার্ষিক বৈঠক নিঃসন্দেহে তার পরিচয় বহন করে। বিগত ২০ বছরে দুটি দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহ বহু ক্ষেত্রে সহযোগিতা ক্রমাগত মজবুত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা প্রতিরক্ষা উপকরণের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ রাশিয়া থেকে আসে। বর্তমানে ভারত রাশিয়া থেকে যে সব প্রতিরক্ষা সরমজাম আমদানির বরাত দিয়েছে, সে গুলির মধ্যে  MIG ও Sukhoi  বিমান, S-400 ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী প্রণালী,  Kamov 226T হেলিকপ্টার ও  T-90 ট্যাংক অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে রাশিয়ার বিজয়ের ৭৫ বর্ষপূর্তিতে গত জুন মাসের ২৪ তারিখে বিজয় দিবস উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং’এর ওই দেশ সফরের সময় এই সব প্রতিরক্ষা উপকরণ শীঘ্রই সরবরাহ কোরতে রাশিয়া আগ্রহ ব্যক্ত করে।

একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্ব, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারিত্ব সত্বেও ভারত-রুশ সম্পর্ক ক্রমাগত মজবুত হয়ে উঠছে।

দুটি দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ছাড়াও অসামরিক পরমাণু শক্তি, তেজঃশক্তি, তেল, গ্যাস , কয়লা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সহযোগিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ভারত-রুশ বাণিজ্যের পরিমাণ আশানুরূপ না হলেও ২০২৫ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মাত্রায় নিয়ে যাবার চেষ্ঠা চলছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে রুশ রাষ্ট্রপতির টেলিফোনে আলোচনা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত করার পথ সুগম করল। আসলে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে ভারত-রুশ সম্পর্ক কেবল পারস্পরিক লাভজনকই নয়, এই সম্পর্ক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।  (মূল রচনাঃ- অশোক সজ্জনহার)